আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীর পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন। ৫,০০০ টন ওজনের অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘কাং কন’-এর নৌ-পরিচালনা পরীক্ষা ও রণপ্রস্তুতি সরজমিনে তদারক করতে গিয়ে তিনি এই নির্দেশনা দেন। এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করে বেইজিং ও পিয়ংইয়ং যৌথভাবে ঘোষণা করেছে, আগামী ৮ ও ৯ জুন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উত্তর কোরিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফর করবেন। বিগত সাত বছরের মধ্যে এটিই হবে উত্তর কোরিয়ায় কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম সফর।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে শনিবার (৬ জুন) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার কিম জং উন ‘কাং কন’ নামক ডেস্ট্রয়ারটির পরীক্ষামূলক চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শনকালে তিনি দেশটির নৌবাহিনীকে দ্রুত এমন একটি অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তরের তাগিদ দেন, যা দেশের পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি প্রধান ও নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হিসেবে কাজ করবে। কিম জং উন স্পষ্ট করে বলেন, পানির ওপরে এবং নিচে যেকোনো শত্রুকে ‘মারাত্মক ও চূড়ান্ত আঘাত’ হানতে সক্ষম একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলা ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির বর্তমান পাঁচ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। একই সাথে সামরিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে ১০,০০০ টনের বড় ডেস্ট্রয়ার নির্মাণ ও নতুন গোপন আন্ডারওয়াটার কৌশলগত অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
সামরিক এই গুরুত্বপূর্ণ পরিদর্শনের সময় কিম জং উনের সাথে দেশটির শীর্ষ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও তার কন্যা জু অ্যেকে অংশ নিতে দেখা গেছে, যা দেশটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। উল্লেখ্য, বর্তমান ‘কাং কন’ ডেস্ট্রয়ারটি গত বছরের মে মাসে প্রথমবার উদ্বোধনের সময় আংশিক উল্টে গিয়ে একটি বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। পরবর্তীতে জরুরি সংস্কার ও মেরামত শেষে এক মাস পর এটি পুনরায় সফলভাবে পানিতে নামানো হয়।
কিম জং উনের এই সামরিক তৎপরতার ঠিক পরপরই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফরের ঘোষণাটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত মাসে বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ধারাবাহিক ও উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ বৈঠক শেষ করার পরপরই শি জিনপিংয়ের এই উত্তর কোরিয়া সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই সফর মূলত মার্কিন প্রভাব বলয়কে মোকাবিলা করতে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় কৌশলগত অক্ষকে আরও সুদৃঢ় করবে।
২০১৯ সালে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে কিম জং উনের শীর্ষ বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই নিষ্ফল হওয়ার পর থেকে পিয়ংইয়ং ওয়াশিংটনের সাথে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা থেকে সরে আসে। এর পর থেকে উত্তর কোরিয়া নিজেদের একটি ‘অপরিবর্তনীয় পারমাণবিক রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতার মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান সমীকরণে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সাথে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে পিয়ংইয়ং ইতিমধ্যে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছে, যা কিমের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও দরকষাকষির ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এর আগে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত একটি জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজে শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে কিম জং উনের যৌথ উপস্থিতি বিশ্বমঞ্চে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও সামরিক প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের ঠিক আগমুহূর্তে নতুন সাবমেরিন ব্যবস্থা, ১০,০০০ টনের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ও নৌ-পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এই ঘোষণা মূলত ওয়াশিংটন ও সিউলকে নিজেদের সামরিক শক্তির জানান দেওয়ার একটি সুকৌশলী প্রয়াস।


