অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনীতি ও সামরিক সংঘাত নতুন মোড় নেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ব্যারেল প্রতি দুই ডলারের বেশি বেড়েছে। লেবাননে নতুন করে সামরিক হামলা এবং ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনার পর বিশ্ববাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলের চলমান অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা আগামী দিনগুলোতে জ্বালানির বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।
আন্তর্জাতিক বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ডব্লিউটিআই) ফিউচার মূল্য ২ দশমিক ১০ ডলার বা ২ দশমিক ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই ক্রুডের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৬৪ ডলারে। অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দামও সমান্তরালভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ফিউচার মূল্য ব্যারেল প্রতি ২ দশমিক ৩৩ ডলার বা ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৯৫ দশমিক ৪২ ডলারে পৌঁছেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এবং মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক আলোচনার গুঞ্জনে তেলের দাম কিছুটা কমে এসেছিল। তবে বৈরুতে নতুন করে হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। পরবর্তী সময়ে ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি ও কূটনৈতিক সমাধানের পথকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান ও ইসরায়েলের এই সরাসরি সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারের সরবরাহ চেইনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন রুট ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার কিংবা সেখানে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। এই রুটে যেকোনো ধরনের সামরিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে তা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামকে ১০০ ডলারের ওপরে নিয়ে যেতে পারে।
জ্বালানি তেলের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ওপর সরাসরি পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর চাপ তৈরি হয়। এটি একদিকে যেমন আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। পরিস্থিতির ওপর আন্তর্জাতিক তেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক (OPEC) গভীর নজর রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যের এই ঊর্ধ্বগতি আরও কিছুকাল অব্যাহত থাকবে বলে আভাস দেওয়া হচ্ছে।


