লিওনেল মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এবং ফুটবলীয় রূপান্তরের মহাকাব্য

লিওনেল মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এবং ফুটবলীয় রূপান্তরের মহাকাব্য

ক্রীড়া ডেস্ক

২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে অন্যতম প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ৩৮ বছর বয়সে পদার্পণ করা এই কিংবদন্তি ফুটবলার চলতি বিশ্বকাপেই তার ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ আসরে অংশ নিতে যাচ্ছেন। এর মাধ্যমে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও গুইলার্মো ওচোয়ার সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের একটি বিরল বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করবেন তিনি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পেশাদার ফুটবলের শীর্ষস্তরে টিকে থাকার পেছনে মেসির কৌশলগত রূপান্তর এবং আধুনিক ফুটবলের সাথে তার অভিযোজন ক্ষমতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকগণ।

২০০৩ সালে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন মেসির অভিষেক হয়, তখন তিনি মূলত একজন প্রথাগত উইঙ্গার হিসেবে খেলতেন। সে সময় তার খেলার মূল ভিত্তি ছিল গতি, চপলতা এবং ডানপ্রান্ত থেকে ড্রিবলিং করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে ফেলা। তবে সময়ের সাথে সাথে আধুনিক ফুটবলের শারীরিক ও কৌশলগত পরিবর্তন এবং নিজের বয়সের সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় নিয়ে মেসি অন্তত পাঁচবার তার খেলার ধরন পরিবর্তন করেছেন।

মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তনটি আসে ২০০৯ সালে, তৎকালীন বার্সেলোনা কোচ পেপ গার্দিওলার অধীনে। রিয়াল মাদ্রিদের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মেসিকে ডান উইং থেকে সরিয়ে মাঠের মাঝখানে প্রথাগত স্ট্রাইকারের পজিশনে নিয়ে আসা হয়। তবে তিনি প্রথাগত স্ট্রাইকারের মতো বক্সের ভেতর সীমাবদ্ধ না থেকে নিচে নেমে এসে মাঝমাঠ থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া শুরু করেন। ফুটবল ইতিহাসে এই ভূমিকাটি ‘ফলস নাইন’ বা ছদ্ম স্ট্রাইকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ২০১১ থেকে २०१৩ সালের মধ্যে মেসি স্প্যানিশ লা লিগায় মাত্র ৬৯ ম্যাচে ৯৬টি গোল করার অনন্য কীর্তি স্থাপন করেন, যা তাকে একাধিকবার ব্যালন ডি’অর জয়ে সহায়তা করে।

২০১৫ সালের পর বার্সেলোনার ঐতিহ্যবাহী মাঝমাঠের প্রধান দুই স্তম্ভ জাভি হার্নান্দেজ এবং আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার বিদায়ের পর মেসির খেলায় পুনরায় পরিবর্তন আসে। দলে গোলদাতার পাশাপাশি মাঝমাঠ পরিচালনার দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়। এই সময় তিনি নিজেকে একজন দক্ষ ‘প্লে-মেকার’ বা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে পুনর্গঠিত করেন, যেখানে গোল করার চেয়ে গোল করানোর কারিগর হিসেবে তার ভূমিকা প্রধান হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির নেতৃত্ব ও ক্যারিয়ার ছিল উত্থান-পতনে ভরা। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ এবং পরবর্তী দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়ের পর তিনি সাময়িকভাবে অবসরের ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন করেন। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয় আর্জেন্টিনার ফুটবলে এক নতুন যুগের সূচনা করে। কাতার বিশ্বকাপে মেসিকে একই সাথে একজন উইঙ্গার এবং দলের প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে দেখা গেছে।

বর্তমানে ইন্টার মায়ামি এবং জাতীয় দলের ম্যাচগুলোতে মেসির খেলার ধরনে নতুন এক কৌশল পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মেসি এখন মাঠে অতিরিক্ত দৌড়ানোর পরিবর্তে হেঁটে ম্যাচ পর্যবেক্ষণ করেন। এটি মূলত তার শক্তি সঞ্চয়ের একটি জাদুকরী কৌশল, যার মাধ্যমে তিনি ম্যাচের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সঠিক মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে খেলার ফলাফল নির্ধারণ করেন। পেশিশক্তির আধুনিক ফুটবলে মস্তিস্কের ব্যবহার এবং কৌশলগত অভিযোজনের মাধ্যমে নিজেকে বারবার ভেঙে গড়ার এই প্রক্রিয়াই লিওনেল মেসিকে দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষস্থানে টিকিয়ে রেখেছে।

খেলাধূলা শীর্ষ সংবাদ