অপরাধ ডেস্ক
গ্রাহকের অজান্তেই ক্রেডিট কার্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেনকে (৪০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত সোমবার (৮ জুন) বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান থানাধীন ৩২ নম্বর রোডের কমার্শিয়াল কোভ ভবন এলাকা থেকে সিআইডির ঢাকা মেট্রো (পশ্চিম) এর একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত সারোয়ার হোসেনের বাবার নাম গোলাম মাওলা।
সিআইডি ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত সারোয়ার হোসেন ২০১৭ সালে একটি স্বনামধন্য বেসরকারি ব্যাংকে সিনিয়র রিলেশনশিপ অফিসার (কার্ড সেলস, রিটেইল ব্যাংকিং) পদে কর্মরত ছিলেন। ওই সময়ে এক গ্রাহক ক্রেডিট কার্ডের জন্য আবেদন করেন। তবে পরবর্তীতে কার্ডটির আর প্রয়োজন না হওয়ায় গ্রাহক সেটি ব্যাংকে ফেরত দেন। সারোয়ার হোসেন নিয়ম অনুযায়ী কার্ডটি ব্যাংকে জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যাংক নথিতে ভুয়া মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা ব্যবহার করে ক্রেডিট কার্ডটির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন, যাতে লেনদেন সংক্রান্ত সব ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) তার ফোনে পৌঁছায়। এই জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি কার্ডটি ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে অননুমোদিত আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করে আসছিলেন।
ঘটনাটি প্রকাশ পায় সম্প্রতি ভুক্তভোগী গ্রাহক বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) রিপোর্ট সংগ্রহ করার পর। সেখানে তিনি দেখতে পান যে, তার নামে ২০১৭ সালে একটি ঋণ ইস্যু করা হয়েছে এবং তা এখনো খেলাপি হিসেবে দেখাচ্ছে। অথচ এই ঋণের বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না এবং কোনো অর্থও উত্তোলন করেননি। বিষয়টি জানার পর ভুক্তভোগী গ্রাহক বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করলে সারোয়ার হোসেনের এই জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হয়।
তদন্তে উঠে আসে, গ্রাহকের অজ্ঞাতে ওই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ২০১৭ সালের শেষভাগ থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে মোট ১৭ লাখ ৭০ হাজার ২১৩ টাকা লেনদেন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ১৪ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করা হলেও, লভ্যাংশসহ অবশিষ্ট ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৫ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, সারোয়ার ২০১৯ সালে ওই ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিলেও ক্রেডিট কার্ডটি নিজের কাছে রেখে অবৈধ লেনদেন অব্যাহত রেখেছিলেন।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে জালিয়াতি নিশ্চিত হওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষে ডিএমপির তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় গত ১৫ এপ্রিল একটি মামলা দায়ের করা হয়। দণ্ডবিধির ৪০৮, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ এবং ৪৭১ ধারায় দায়ের করা এই মামলার (মামলা নং-৩৫) তদন্তভার পরবর্তীতে সিআইডির ঢাকা মেট্রো (পশ্চিম) ইউনিটের ওপর ন্যস্ত করা হয়। সিআইডি তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গত সোমবার আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
সিআইডি জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত সারোয়ার হোসেন জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি ব্যাংকিং খাতের পেশাগত মর্যাদার অপব্যবহার করে এবং গ্রাহকের সরলতার সুযোগ নিয়ে এই অপরাধ সংগঠিত করেছেন। এই চক্রের সঙ্গে ব্যাংকের অন্য কোনো কর্মকর্তা বা বাইরের কোনো চক্র জড়িত রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। একই সাথে অভিযুক্ত ব্যক্তি অন্য কোনো গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের সাথেও একই ধরনের প্রতারণা করেছেন কিনা, তা নিশ্চিত হতে রিমান্ডের আবেদনসহ তাকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে এই ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধে সিআইডির বিশেষ অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।


