অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশ একটি উপকূলীয় দেশ হওয়ায় সমুদ্র ও নৌ-পথের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করে তার সর্বোত্তম ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি উল্লেখ করেছেন, ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতির পূর্ণ সুবিধা কাজে লাগাতে আধুনিক প্রযুক্তি অর্জন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
সোমবার (২২ জুন, ২০২৬) সকালে রাজধানীর খিলখেতে বানৌজায় নৌ-বাহিনী আয়োজিত ‘বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে নৌ-খাতের বিশেষজ্ঞ, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং সমুদ্র গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
নৌ-পরিবহনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সমুদ্রসীমা জয়-পরবর্তী দীর্ঘসময়ের স্থবিরতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশাল সমুদ্রসীমা লাভ করলেও বিগত বছরগুলোতে যথাযথ নীতিমালার অভাব, উদাসীনতা ও সঠিক সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সমুদ্রের তলদেশে থাকা খনিজসম্পদ আহরণ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে জ্বালানি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।
সমুদ্রসম্পদ, বিশেষ করে জ্বালানি খাতের বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সমুদ্রে গ্যাস ও তেলসহ অন্যান্য জ্বালানি পাওয়া কেবল একটি সম্ভাবনা নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য নিশ্চিত সম্পদ। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের পর নিজ নিজ সমুদ্রসীমায় ব্যাপক অনুসন্ধান ও সফলভাবে খনিজ উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দেশ একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
তবে বর্তমান সরকার এই খাতের উন্নয়নে কৌশলগত পরিবর্তন আনছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসন নীতিগতভাবে অফশোর (গভীর সমুদ্র) এলাকায় নতুন নতুন কূপ অনুসন্ধান, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ চিহ্নিতকরণ এবং পরবর্তীতে তা উত্তোলনের জন্য সুনির্দিষ্ট ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করছে। একই সঙ্গে সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তৈরি ও তথ্য সংগ্রহের জন্য হাইড্রোগ্রাফির ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক ও আধুনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের গুরুত্ব উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ রয়েছে। এই বিশাল জলপথকে যদি সঠিকভাবে ড্রেজিং ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়, তবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নৌযোগাযোগ আরও নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী করা সম্ভব হবে। পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে এটি জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় নির্ভুল হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মূলত চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশই এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাই এই বন্দর দিয়ে নেভিগেশন (জাহাজ চলাচল) ব্যবস্থা আরও নিরাপদ ও আধুনিক করতে আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুসরণের কাজ চলছে।
তিনি স্বীকার করেন যে, অবকাঠামো ও প্রযুক্তির দিক থেকে আন্তর্জাতিক শীর্ষস্থানীয় বন্দরগুলোর তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দর কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, বর্তমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বন্দরের সেবার মান বৈশ্বিক পর্যায়ে উন্নীত করতে এবং এর পরিধি আরও বিস্তৃত ও প্রসারিত করতে সরকারের মেগা পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।


