শিক্ষাঙ্গন ডেস্ক
আসন্ন এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার রাজধানীর আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সভায় পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রশ্নফাঁস রোধ, খাতা মূল্যায়ন এবং শিক্ষাজীবনের সময়ক্ষেপণ কমিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের নানামুখী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের মূল্যবান সময় রক্ষা এবং সেশনজট নিরসনে পরীক্ষা সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, দুই বছরের নির্ধারিত কোর্স শেষ হওয়ার পরপরই যাতে পাবলিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারি মাসে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে এবং আগামী ২ জুলাই থেকে দেশব্যাপী একযোগে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে।
শিক্ষাজীবনে সময়ক্ষেপণের নেতিবাচক প্রভাব উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে একজন শিক্ষার্থী ছয় বছর বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এসএসসি সম্পন্ন করতে ১৬ বছর বয়সে পৌঁছায়। এর পরবর্তী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় শেষ করতে অতীতে পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশের দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিক্ষার্থীর বয়স প্রায় ২০ বছর ছুঁয়ে যেত। এর ফলে তরুণদের উৎপাদনশীল সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনি দেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগ ব্যাহত হয়। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের সময়কে যুগোপযোগী ও সমন্বিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় উৎসব রমজান ও ঈদকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা হলেও নির্ধারিত পাঠ্যসূচি বা কোর্স সম্পূর্ণরূপে শেষ করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
পাবলিক পরীক্ষায় যেকোনো ধরনের অনিয়ম, নকল এবং ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নকলের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধের আধুনিক রূপ বিবেচনায় নিয়ে পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত আইন সংশোধন করা হয়েছে। পরীক্ষার হলে কোনো ধরনের অসদুপায় বা ডিজিটাল জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কেবল সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীই নয়, দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি জানান, বিগত পরীক্ষাগুলোতে মন্ত্রণালয় সরাসরি তদারকি করে সম্ভাব্য দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার সারা দেশে একক প্রশ্নপত্র ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রশ্নফাঁস বা অন্য কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের গুণগত মান নিশ্চিত করতেও আনা হয়েছে বিশেষ পরিবর্তন। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত খাতা মূল্যায়নের চাপ থাকত, যা নিখুঁত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ করত। এই সমস্যা সমাধানে পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, পরীক্ষকের সংখ্যা সম্প্রসারণ এবং প্রত্যেক শিক্ষককে সীমিত সংখ্যক খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, খাতার স্যাম্পলিং বা নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়নের সামগ্রিক মান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রিটেস্ট ও টেস্ট পরীক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘ইনহাউস কোচিংয়ের’ ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই অতিরিক্ত পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের সম্মানীর বিষয়টি স্থানীয় গভর্নিং বডি বা ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করার আহ্বান জানান তিনি।
উক্ত মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঢাকার চেয়ারম্যান প্রফেসর আক্তারুজ্জামান এবং সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দারসহ শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।


