খেলাধুলা ডেস্ক
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট একই সাথে মাঠের রোমাঞ্চকর লড়াই এবং মাঠের বাইরের নানামুখী নাটকীয়তায় জমজমাট হয়ে উঠেছে। একদিকে ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে মেক্সিকোর বিমানবন্দরে ইরান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক ও সহকারী কোচকে আটকে রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
ভিনিসিয়ুসের রেকর্ড ও ব্রাজিলের ঐতিহাসিক সমীকরণ
চলতি বিশ্বকাপে রিয়াল মাদ্রিদ তথা ব্রাজিল দলের তারকা ফুটবলার ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় পার করছেন। গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমার্ধেই জোড়া গোল করে দলের জয়ে বড় অবদান রাখেন তিনি। এই অসাধারণ নৈপুণ্যের মধ্য দিয়ে চলমান বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই গোল করার অনবদ্য কীর্তি গড়লেন ব্রাজিলের এই ফরোয়ার্ড।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ভিনিসিয়ুসের এই ধারাবাহিকতা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনই নয়, বরং ব্রাজিলের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের ক্ষেত্রে এক অনন্য ঐতিহাসিক যোগসূত্র তৈরি করেছে। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই কোনো ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় গ্রুপ পর্বের সবকটি ম্যাচে গোল করতে সক্ষম হয়েছেন, তখনই সেলেসাওরা শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে জাইরজিনিও গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করেছিলেন এবং সেবার ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জিতেছিল। এরপর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে কিংবদন্তি রোমারিও একই কীর্তি গড়ে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন। সর্বশেষ ২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদো নাজারিও এবং রিভালদো—দুজনই গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে জালের দেখা পেয়েছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে ব্রাজিল তাদের পঞ্চম শিরোপা ঘরে তোলে। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে জাইরজিনিও, রোমারিও বা রোনালদোদের সেই বিশেষ তালিকায় নাম লেখালেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। অতীতের এই ধারা যদি বজায় থাকে, তবে ব্রাজিলের হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত জোরালো বলে মনে করছেন ফুটবলপ্রেমীরা।
তিজুয়ানা বিমানবন্দরে ইরান দলের জটিলতা ও বিতর্ক
মাঠের এই নান্দনিক আবহ যখন বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের আলোড়িত করছে, ঠিক তখনই মাঠের বাইরের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মেক্সিকোর তিজুয়ানা বিমানবন্দরে ইরান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক মেহেদি তারেমি এবং সহকারী কোচ সাঈদ আলহোইকে বেশ কিছু সময় আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান ফুটবল ফেডারেশন টুর্নামেন্টের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হয়রানি ও বাধা সৃষ্টির অভিযোগ এনেছে।
জানা গেছে, গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে মিশরের মুখোমুখি হতে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল ইরান দল। তবে তিজুয়ানা বিমানবন্দরে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্রজনিত জটিলতায় অধিনায়ক ও সহকারী কোচ আটকে পড়ায় পুরো দলের যাত্রা ব্যাহত হয়। এর আগে মার্কিন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ইরান দলকে ম্যাচের দুদিন আগেই নির্বিঘ্নে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে বিমানবন্দরে সৃষ্ট আকস্মিক এই জটিলতা নির্ধারিত সময়সূচিকে ওলোটপালোট করে দেয়।
ইরান ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দলের প্রধান তারকা ও সহকারী কোচকে ছাড়া বাকি সদস্যরা সিয়াটলের উদ্দেশ্যে যাত্রা না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন। ফলে বিমানবন্দরে পুরো দলকেই দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।
পুনরাবৃত্তির অভিযোগ ও কূটনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও গ্রুপ পর্বে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে লস অ্যাঞ্জেলেস বিমানবন্দর হয়ে মেক্সিকোয় ফেরার সময় একই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন মেহেদি তারেমি ও সাঈদ আলহোই। সে সময় পাসপোর্ট এবং ভিসা সংক্রান্ত অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের অজুহাতে তাদের দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে বসিয়ে রাখা হয়েছিল।
ইরান ফুটবল ফেডারেশন তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে, বিশ্বকাপের মতো একটি আন্তর্জাতিক মর্যাদাসম্পন্ন টুর্নামেন্টের প্রধান আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের জন্য একটি বৈষম্যহীন এবং বাধাহীন পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু একই দলের সদস্যদের বারবার বিমানবন্দরে এই ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মুখে ফেলার ঘটনা টুর্নামেন্টের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে রাজনৈতিক বৈরিতা বা কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব খেলার মাঠে পড়া উচিত নয় বলে মনে করেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা। মাঠের বাইরের এই উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং মানসিক ধকল ইরানের খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্সে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। অন্যদিকে, ভিনিসিয়ুসের ঐতিহাসিক সৌভাগ্যের ধারা বজায় রেখে ব্রাজিল তাদের স্বপ্নের ট্রফিটি পুনরুদ্ধার করতে পারে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব।


