চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: জুন মাসেই আক্রান্ত ১২২ জন

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: জুন মাসেই আক্রান্ত ১২২ জন

চট্টগ্রাম ব্যুরো / স্বাস্থ্য ডেস্ক

চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি বছরের জুন মাসে আক্রান্তের সংখ্যা এর আগের মাসের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেড়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২ জুলাই সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৯ জনের শরীরে ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত হয়েছে। এই নিয়ে চলতি বছরে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০৭ জনে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত একজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত মাসিক তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তী মাসগুলোতে এই সংখ্যা যথাক্রমে ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন, মার্চে ২০ জন, এপ্রিলে ২৯ জন এবং মে মাসে ৩৭ জনে দাঁড়ায়। তবে জুন মাসে সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করে এবং একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ ১২২ জন রোগী শনাক্ত হন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মে মাসের তুলনায় জুন মাসে আক্রান্তের এই আকস্মিক বৃদ্ধি চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, জুন ও জুলাই মাসে বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার প্রজনন সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়। ফলে অবক্ষয়িত আবহাওয়া ও জমে থাকা পানি ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়িয়ে তোলার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, পূর্ণাঙ্গ বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত সতর্কবার্তা বহন করে। দ্রুত ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের হার জ্যামিতিক হারে বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের শরীরে সুনির্দিষ্ট কিছু ক্লিনিক্যাল উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী জানান, হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে তীব্র জ্বর, তীব্র শরীরব্যথা, বমি ভাব এবং খাবারে অরুচির মতো লক্ষণ প্রধান। চিকিৎসকদের পরামর্শ, এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে কোনো প্রকার অবহেলা না করে কিংবা নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হলে ডেঙ্গুজনিত জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব।

এদিকে ডেঙ্গু সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির মুখে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকার নাগরিকদের অভিযোগ, ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত মশক নিধন ক্রাশ প্রোগ্রাম বা মশার ওষুধ ছিটানোর দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। চসিকের পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রমের এই স্থবিরতা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন।

নাগরিকদের এই অভিযোগের বিপরীতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহি দাবি করেন, সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত ক্রাশ প্রোগ্রাম এবং লার্ভিসাইড ছিটানোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস করার জন্য বিশেষ টিম কাজ করছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশে এখন বছরজুড়েই ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। তবে বর্ষা মৌসুমে এর তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর মশক নিধন অভিযানের পাশাপাশি নাগরিকদের নিজস্ব আঙ্গিনা ও ছাদবাগান পরিচ্ছন্ন রাখা, তিন দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া এবং ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করার মতো ব্যক্তিগত সচেতনতাই এই সংক্রামক ব্যাধি থেকে পরিত্রাণের প্রধান উপায় হতে পারে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ