জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার এবং নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষায় যৌথ অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হয়েছেন। আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রীর দফতর কক্ষে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নারী ও শিশুদের টেকসই উন্নয়ন, লিঙ্গ সমতা, নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নির্মূলসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের চলমান সামাজিক নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বর্তমান সরকারের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরে মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানান, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা নির্মূলের মাধ্যমে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈঠকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন এনডিসি উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনাকালে সামাজিক নিরাপত্তা খাত এবং নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেন যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক। তিনি দেশের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। বিশেষত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের বিষয়ে দুই পক্ষ একমত পোষণ করে।
বৈঠকে মন্ত্রী মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত বিভিন্ন সেবামূলক এবং সুরক্ষামূলক কার্যক্রমের বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারের ডিএনএ ল্যাবরেটরি (DNA Lab), ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (OSCC) এবং কুইক রেসপন্স টিম (QRT) কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপরাধী শনাক্তকরণের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থায় গতিশীলতা এসেছে বলে তিনি জানান।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে সরকার দেশের চা শ্রমিক, সাঁওতাল এবং পার্বত্য অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া নারীদের শিক্ষা, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করছে। নারীদের স্বাবলম্বী ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে হস্তশিল্প এবং কেয়ার-গিভিং (সেবাপ্রদান) বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং ঝরে পড়া রোধে বিনামূল্যে মিড-ডে মিল ও ইউনিফর্ম প্রদানের মতো কল্যাণমুখী কর্মসূচির কথাও বৈঠকে জানানো হয়।
বৈঠকে অন্যতম প্রধান განსახილველი বিষয় ছিল সরকারের সর্বজনীন ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। হাইকমিশনার এই কর্মসূচির কার্যকারিতা সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করলে মন্ত্রী জানান, দেশের অবহেলিত, অসচ্ছল এবং নিম্নবিত্ত নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে অনলাইনে নারীদের নামে এই কার্ড ইস্যু করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ধর্মীয়, বর্ণগত বা রাজনৈতিক মতাদর্শকে বিবেচনা না করে কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের নির্বাচন করা হচ্ছে।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের নারীদের উৎপাদিত হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন পণ্য যাতে যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি করা যায়, সে বিষয়ে মন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিশেষ সহযোগিতা চাওয়া হয়। হাইকমিশনার সারাহ কুক এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেন এবং বাংলাদেশের নারী ফুটবল ও ক্রিকেট দলের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বৈঠকের শেষাংশে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও শরণার্থী সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। হাইকমিশনার সারাহ কুক মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তরাজ্যের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। একই সাথে একটি টেকসই ও নিরাপদ প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনের বিষয়েও তিনি গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।


