অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
রাশিয়া থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে মার্কিন সিনেটে একটি নতুন বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবিত বিল পাস হলে ভারত, চীন, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার মার্কিন সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল এই বিলের খসড়া ও এর যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের আয়ের উৎস সংকুচিত করাই এই বিলের মূল লক্ষ্য। যেসব দেশ রাশিয়া থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস ক্রয় অব্যাহত রেখেছে, তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবেই নির্দিষ্ট হারে উচ্চ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে নীতিনির্ধারকদের ভাষ্যমতে, বিশেষ ও জরুরি ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট কিছু দেশের জন্য শুল্ক ছাড়ের সুযোগ বা নমনীয়তা রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই বিলটি মূলত রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের ওপর একটি প্রত্যক্ষ আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কেবল তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং যারা রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করছে, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পথ প্রশস্ত করবে। মার্কিন সিনেটের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, বিলটির পক্ষে ইতিমধ্যে ২৬ জন সিনেটর সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এবং আগামী দিনগুলোতে সমর্থকের সংখ্যা আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, অতীতেও রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপের চেষ্টা করা হয়েছিল। গত বছর রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, যা সে সময় আইনি রূপ পায়নি। বর্তমানের এই নতুন বিলটিকে সেই আগের প্রচেষ্টার একটি সংশোধিত ও বাস্তবসম্মত সংস্করণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এই পদক্ষেপের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শুল্কনীতি এবং তা নিয়ে আইনি লড়াইয়ের একটি ইতিহাস রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন দেশের ওপর জাতীয় জরুরি অবস্থা ব্যবহার করে আমদানি শুল্ক চাপিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন, যা দেশটির উচ্চ আদালতের আইনি বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান নতুন শুল্ক আরোপের কৌশল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অর্থনৈতিক মহলে নানামুখী জল্পনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিল যদি আইন হিসেবে কার্যকর হয়, তবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী, কারণ এই দেশগুলো তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনে রাশিয়ার ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হলে তা কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক নয়, বরং সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বর্তমানে বিলটি মার্কিন সিনেটে আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটি কত দ্রুত কার্যকর করা হবে বা এর চূড়ান্ত খসড়ায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা দেখার জন্য এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর ওয়াশিংটনের দিকে। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


