অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া প্রস্তুত

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া প্রস্তুত

আইন ও বিচার ডেস্ক

পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা দুটি অধ্যাদেশের বিভিন্ন অসংগতি ও সীমাবদ্ধতা দূর করতে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিল করে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে।

আইনি খসড়া দুটির ওপর বিভিন্ন অংশীজনের মতামত গ্রহণের লক্ষ্যে রবিবার (১৭ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা অংশ নেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন লিলার এবং গুমের শিকার সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী ও সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদী। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী।

সভায় উপস্থিত অংশীজনরা প্রস্তাবিত খসড়া দুটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ও আপত্তি তুলে ধরেন। বিশেষ করে, গুমের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করা হয়। আলোচকদের মতে, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে, একজন এসআইয়ের পক্ষে নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে, অভিযুক্ত বাহিনীর সদস্যদের অপরাধ তদন্তে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকেই যুক্ত করার বিধান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অনেকে আইন দুটি চূড়ান্ত করার আগে দেশব্যাপী গণশুনানির আয়োজন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা কমিশনের নিজস্ব এখতিয়ারে রাখার দাবি জানান।

খসড়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, নতুন আইনে গুমকে সরাসরি ‘ফৌজদারি অপরাধ’ (ক্রিমিনাল অফেন্স) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর ফলে গুমের ঘটনাগুলো কেবল মানবাধিকার কমিশনের অনুসন্ধান বা তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী এর বিচার ও কঠোর তদন্তের পথ সুগম হবে। এছাড়া পূর্ববর্তী অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন খসড়ায় শাস্তির বিধান আরও কঠোর করা হয়েছে। আগের অধ্যাদেশে যাবজ্জীবনের পাশাপাশি ‘অনধিক ১০ বছর’ কারাদণ্ডের বিধান থাকায় বিচারকের ন্যূনতম সাজা দেওয়ার সুযোগ ছিল। প্রস্তাবিত আইনে গুমের অপরাধে ন্যূনতম ১০ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো থানা গুমের অভিযোগ বা মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানালে ভুক্তভোগী পরিবার সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করতে পারবে। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। খসড়ায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে—রাজনৈতিক কারণ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কিংবা অখণ্ডতার অজুহাত দেখিয়ে কোনো নাগরিককে জোরপূর্বক নিখোঁজ বা গুম করা যাবে না।

সভায় সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদী বাংলাদেশ থেকে গুমের সংস্কৃতি চিরতরে নির্মূলের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এমন একটি কার্যকর আইন প্রয়োজন যা কেবল ভবিষ্যতের অপরাধই রোধ করবে না, বরং অতীতে গুম হওয়া ব্যক্তিদের নিখোঁজের রহস্য উদ্ঘাটন ও বিচার নিশ্চিত করবে। তিনি ২০১২ সালে গুম হওয়া তাঁর স্বামী এম ইলিয়াস আলীর দীর্ঘ ১৪ বছরেও কোনো সন্ধান না পাওয়ার ক্ষোভ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, রাষ্ট্র আর কোনো গুমের ঘটনা দেখতে চায় না এবং একটি কার্যকর, স্বাধীন ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠন করতে বদ্ধপরিকর। অতীতের কমিশনগুলো অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন আইনে প্রতিটি আইনি প্রক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনকে আদালতে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য বা প্রমাণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আসন্ন বাজেট অধিবেশনের পর জাতীয় সংসদে আইন দুটি পাসের জন্য উত্থাপন করা হতে পারে বলে তিনি জানান।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ