অনলাইন ডেস্ক
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান বেসরকারি চাকরিজীবী মনিরুজ্জামান। গত বুধবার রাত সাড়ে আটটায় কারওয়ান বাজার স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। ট্রেনের পর ট্রেন এলেও স্টেশনে অপেক্ষমাণ শত শত মানুষের চাপে প্রথম ট্রেনটিতে তিনি উঠতেই পারেননি। অনেক কসরত করে দ্বিতীয় ট্রেনে উঠলেও ভেতরে দাঁড়ানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না।
এই যে ট্রেনের পেছনে ট্রেন আসার পরও হুড়োহুড়ি, এর মূল কারণ হলো একসঙ্গে প্ল্যাটফর্মে শত শত যাত্রীর প্রবেশ এবং দ্রুততম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদ। ঢাকার কর্মব্যস্ত মানুষ এখন এক মিনিটও অপচয় করতে রাজি নন, যার ফলে ট্রেন আসার সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায় ভেতরে ঢোকার প্রতিযোগিতা।
লিঙ্গভিত্তিক নিরাপত্তা ও স্বস্তি, নারী যাত্রীদের চোখে মেট্রো এখন এক আস্থার প্রতীক। রাতের ঢাকা যেখানে নারীদের যাতায়াতের জন্য প্রায়ই অনিরাপদ ও অস্বস্তিকর বলে বিবেচিত হয়, সেখানে মেট্রোরেল এনেছে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। আট জুনের এক রাতের ঘটনা উল্লেখ করে এক বেসরকারি চাকুরিজীবী নারী জানান, রাত দশটার পর কারওয়ান বাজার স্টেশন থেকে তাঁর সঙ্গে আরও অন্তত দশ জন নারী যাত্রী নারীদের জন্য সংরক্ষিত বিশেষ কোচে উঠেছেন।
তিনি অত্যন্ত স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, মেট্রোরেল যদি এই বাড়তি সময় না চলত, তবে আমাদের এই রাতে বাসে বা অন্য কোনো অনিরাপদ যানবাহনে ঝুঁকি নিয়ে ফিরতে হতো। ঢাকার রাস্তায় মূলত রাত এগারোটা পর্যন্ত মানুষের প্রচণ্ড চাপ থাকে। মেট্রোরেলে যদি রাত এগারোটা বা তার পর পর্যন্ত সচল রাখা যায়, তবে কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় মেট্রোরেল, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বড় পরিবর্তন। ডিএমটিসিএলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সময় বাড়ানোর আগে কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে দৈনিক চার লাখের কাছাকাছি যাত্রী যাতায়াত করতেন। কিন্তু সময়সূচিতে সামান্য পরিবর্তনের পর গত রবিবার যাত্রীসংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে চার লাখ ঊনত্রিশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
মেট্রোরেলের মূল প্রকল্প পরিকল্পনার সময় অনুমান করা হয়েছিল, উত্তরা থেকে মতিঝিল রুটে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ লাখ যাত্রী যাতায়াত করবেন। বর্তমানে গড়ে সোয়া চার লাখ যাত্রী নিয়ে মেট্রোরেল প্রায় সেই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
দৈনিক গড় যাত্রীসংখ্যা বর্তমানে চার লাখ পঁচিশ হাজারেরও বেশি এবং কমলাপুর সম্প্রসারণসহ ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা আগামী বছর দাঁড়াবে ছয় লাখ ৭৭ হাজার। সর্বোচ্চ দৈনিক যাত্রী ইতিমধ্যে চার লাখ ঊনত্রিশ হাজারেরও বেশি ছাড়িয়েছে। সার্বক্ষণিকভাবে চব্বিশ সেটের মধ্যে বর্তমানে বারো সেট ট্রেন সচল আছে এবং ভবিষ্যতে চৌদ্দ সেট ট্রেন ট্র্যাকে নামানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সর্বনিম্ন ট্রেনের ব্যবধান বর্তমানে সাড়ে তিন মিনিটের সক্ষমতা রয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নযোগ্য।
বর্তমানে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা আশা করছে, আগামী বছরের মধ্যে এই বর্ধিত অংশটি চালু করা সম্ভব হবে। আর কমলাপুর স্টেশন চালু হলে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা এক লাফে ছয় লাখ ৭৭ হাজারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সময় পরিবর্তন কি সময়ের দাবি, কর্তৃপক্ষের ভাবনাও এখন ইতিবাচক। সকাল বেলার শুরুর দিকের চেয়ে রাতের বেলাতেই এখন মেট্রোরেলে যাত্রীদের চাপ ও চাহিদা তুলনামূলক বেশি। এই বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ রাতের সময়সীমা আরও বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বের সাথে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী মাস থেকেই নতুন সময়সূচি কার্যকর হতে পারে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাতের সর্বশেষ ট্রেনটি মতিঝিল থেকে রাত এগারোটায় এবং উত্তরা থেকে রাত দশটা বিশ মিনিটে ছাড়বে। অর্থাৎ, বর্তমান সময়সূচির চেয়ে আরও ত্রিশ মিনিট সময় বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তবে সকালে ট্রেন চালুর সময়, উত্তরা থেকে সকাল সাড়ে ছয়টা এবং মতিঝিল থেকে সকাল সোয়া সাতটা, এগিয়ে আনার কোনো পরিকল্পনা আপাতত কর্তৃপক্ষের নেই। কারিগরি চ্যালেঞ্জ ও সাজসজ্জা, কেন হুট করেই সময় বাড়ানো সম্ভব নয় তা স্পষ্ট করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, সাড়ে তিন মিনিট পর পর ট্রেন চালানোর সক্ষমতা এবং মধ্যরাত পর্যন্ত মেট্রো সচল রাখার প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও কেন তা ধাপে ধাপে করা হচ্ছে? এর উত্তরে ডিএমটিসিএলের পরিচালক, অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বা পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ, নজরুল ইসলাম কিছু বাস্তব কারিগরি চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, মেট্রোরেল বন্ধ হওয়া এবং সকালে পুনরায় চালু হওয়ার মধ্যবর্তী মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্ল্যাক,আউটে ট্রেনের ইঞ্জিন, কোচ, বৈদ্যুতিক লাইন এবং ওয়ার্কশপে ব্যাপক মেকানিকেল ও টেকনিক্যাল মেইনটেন্যান্স বা যান্ত্রিক ও কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। যাত্রী সুরক্ষার স্বার্থে এই রুটিন চেকিংয়ে কোনো ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। তাই চলাচলের সময় বাড়াতে হলে ব্যাক,অ্যান্ডে ব্যাপক কারিগরি ও জনবলের প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে।
বর্তমানে উত্তরা,মতিঝিল রুটে মোট চব্বিশ সেট ট্রেন রয়েছে, যার প্রতিটিতে ছয়টি করে কোচ যুক্ত। পিক আওয়ারে বর্তমানে বারো সেট ট্রেন অবিরাম চলে। যদি আগামী মাসে রাতের সময় আরও ত্রিশ মিনিট করা হয়, তবে ট্রিপের সংখ্যা বজায় রাখতে সার্বক্ষণিকভাবে চৌদ্দ সেট ট্রেন ট্র্যাকে নামাতে হবে। বর্তমানে এই অতিরিক্ত সেটগুলো পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জনবল প্রস্তুত করার কাজই চলছে।
যানজটমুক্ত ঢাকার বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে এই মেট্রো। দুই হাজার বাইশ সালের আঠাশ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত যাত্রার মাধ্যমে যে স্বপ্নের সূচনা হয়েছিল, দুই হাজার তেইশ সালের শেষ দিনে মতিঝিল পর্যন্ত তা পূর্ণতা পায়। আর দুই হাজার ছাব্বিশ সালে এসে এটি ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার মেরুদণ্ডে পরিণত হয়েছে। স্টেশনে স্টেশনে ট্রেনের দ্রুত আগমন এবং যাত্রীদের হুড়োহুড়ি প্রমাণ করে যে, ঢাকাবাসী এই আধুনিক ব্যবস্থার ওপর কতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
প্রতি মিনিটে ট্রেন আসার পরও যে চাপাচাপি, তা আসলে সময়ের পরিবর্তন বা ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নয়, বরং এটি ঢাকার বিপুল জনসংখ্যার এক জীবন্ত প্রতিফলন। আগামী মাসে রাতের সময়সীমা আরও ত্রিশ মিনিট বাড়ানো হলে এবং আগামী বছর কমলাপুর স্টেশন চালু হলে এই চাপ হয়তো আরও সুষমভাবে বণ্টিত হবে। তবে আপাতত, রাতের ঢাকার চাকা সচল রাখতে মেট্রোরেলের সময়সীমা বৃদ্ধি কেবল জনদাবিই নয়, সময়ের এক অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা।


