রাজনৈতিক ডেস্ক
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী ও তেজগাঁও এলাকার চাঁদাবাজিতে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন। সোমবার (১৮ মে) সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট সংলাপে তিনি এ অভিযোগ করেন। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এবং বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে।
সংলাপে অংশ নিয়ে সাইফুল আলম খান মিলন ঢাকা শহরের পাইকারি বাজার ও পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেছেন বলে জানান। রাজধানীর অন্যতম বৃহত্তম পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের স্বার্থ সুরক্ষায় অবিলম্বে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেত্রী মাহমুদা হাবীবা চাঁদাবাজদের পরিচয় ও সুনির্দিষ্ট তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললে জামায়াত সংসদ সদস্য উল্লেখ করেন, এই চাঁদাবাজি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পূর্বেও সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং বর্তমানেও একই ধারা বজায় রয়েছে। কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি যুবদল নেতা মোছাব্বিরের নিহত হওয়ার ঘটনাটি তিনি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে কারা জড়িত, তা সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ অবগত রয়েছে।
তিনি আরও প্রকাশ করেন, ঢাকার এই প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর চাঁদাবাজি নিয়ে অনুসন্ধান বা প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের ঝুঁকি রয়েছে বলে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা তাকে সতর্ক করেছেন। এ বিষয়ে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ এবং সহযোগিতা কামনা করবেন বলে সংলাপে জানান। বিএনপি নেত্রী মাহমুদা হাবীবা নাগরিক অধিকার রক্ষায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ বা মামলা করার পরামর্শ দিলে, জামায়াত সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন যে পুলিশ প্রশাসন এই সংক্রান্ত মামলা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করছে।
এদিকে প্রাক-বাজেট সংলাপে দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি এবং আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সংলাপে মূল বক্তব্য উপস্থাপনকালে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা অভ্যন্তরীণ বাজারকে আরও সংকুচিত করেছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ফলে সংস্থাটির দেওয়া বিভিন্ন কঠোর শর্ত ও সংস্কার কর্মসূচি পরিপালন করেই সরকারকে আগামী বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে। তবে নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকায়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং জনস্বার্থের সমন্বয় ঘটানোই হবে আগামী বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ।
সংলাপে অন্য বক্তারা বলেন, দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তারা যাতে করের অতিরিক্ত বোঝা থেকে রেহাই পান, সেদিকে বাজেটে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বাজার ব্যবস্থাপনা সচল রাখতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে আরও বক্তব্য দেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক। বক্তারা তৈরি পোশাক খাতসহ দেশের সামগ্রিক শিল্পায়নের গতি ধরে রাখতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আগামী বাজেটে সুনির্দিষ্ট নীতিগত সহায়তার আহ্বান জানান।


