যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ঐতিহাসিক সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে: খুলছে হরমুজ প্রণালী, কাটছে নৌ অবরোধ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ঐতিহাসিক সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে: খুলছে হরমুজ প্রণালী, কাটছে নৌ অবরোধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ধরে চলা তীব্র সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। প্রস্তাবিত এই চুক্তির আওতায় বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত জ্বালানি পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলি ভূখণ্ডে পাল্টা হামলা চালায়। সংঘাতের একপর্যায়ে ইরান বিশ্ব বাজারের প্রায় ২০ শতাংশ খনিজ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ করে দেয়। এপ্রিল মাসে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও উভয় পক্ষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘাত অব্যাহত ছিল, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় প্রস্তুতকৃত এই সমঝোতা স্মারকটি মূলত দুই ধাপে বাস্তবায়িত হবে। প্রথম ধাপের মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—আগামী ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং নৌ চলাচলের জন্য এটি উন্মুক্ত করা। তবে তেহরান স্পষ্ট করেছে যে, হরমুজ প্রণালীর সার্বভৌমত্ব ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শুল্কমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করা হলেও নির্দিষ্ট কিছু ‘সার্ভিস ফি’ বা সেবা মূল্য আদায় করা হবে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত সম্পূর্ণ নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করে নেবে।

চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের পর পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য একটি বর্ধিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এই সময়ে দুই দেশ সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় অর্থাৎ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে দ্বিতীয় ধাপের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে। ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত বৃদ্ধি বন্ধ রাখবে এবং বিদ্যমান মজুত কেবল নিজস্ব ভূখণ্ডেই লঘুকরণ (ডিলিউশন) করবে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধের বিষয়টিও চুক্তির শর্তাবলীতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিনিময়ে ওয়াশিংটন বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধাপে ধাপে অবমুক্ত করার পাশাপাশি তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আশ্বাস দিয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই কূটনৈতিক অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ এর খসড়া সম্পূর্ণ চূড়ান্ত এবং এটি এখন কেবল আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে এখনো জটিলতা কাটেনি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে, দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ভেতরে এই চুক্তি নিয়ে সমর্থক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছে।

এদিকে, চুক্তির পরিধি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কিছু পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন, এই চুক্তির আওতায় লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, লেবানন সংকটকে এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাইরে রাখা হতে পারে। একই সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর রকেট হামলা অব্যাহত থাকলে তারা লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও চুক্তির কিছু ধারা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ইরান চুক্তি বাস্তবায়নে পূর্ণ সততা না দেখালে কোনো অর্থ বা সম্পদ আগাম অবমুক্ত করা হবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, বিগত মাসগুলোতে একাধিকবার চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েও শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে গিয়েছিল। তবে এবার উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনেক বেশি নমনীয় ও খোলামেলা আলোচনা করছে, যা চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই চুক্তি সফলভাবে স্বাক্ষরিত হলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনবে না, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ