মাদক নিয়ন্ত্রণে কর্মকর্তাদের অস্ত্র প্রদান ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ

মাদক নিয়ন্ত্রণে কর্মকর্তাদের অস্ত্র প্রদান ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ

জাতীয় ডেস্ক

দেশে দিন দিন মাদকাসক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মাদক চক্রগুলোর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মুখে বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কারের বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের অস্ত্র দেওয়ার পাশাপাশি মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কাজও হাতে নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষে সচিবালয়ের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে এই নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনে নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ১৫টি বেসরকারি মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রকে অনুদানের চেক হস্তান্তর করা হয়।

অনুষ্ঠানে সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমান মাদক পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের ব্যাপক বিস্তারের কারণে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই বিশাল সংখ্যক আসক্ত জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন দিয়ে এই অপরাধ চক্রকে দমন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে স্বীকার করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মাদক চোরাকারবারি চক্রগুলো যখন অত্যাধুনিক অস্ত্র ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তখন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরস্ত্র অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। কার্যকর সুরক্ষার অভাব ও আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে মাঠপর্যায়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই সাংগঠনিক দুর্বলতা দূর করতে মাদক আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আগামী সংসদ অধিবেশনেই বিল আকারে উত্থাপিত হতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আইনটি পাস হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের কার্যক্ষমতা ও নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

আইনি সংস্কারের পাশাপাশি মাদক মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে সারা দেশের আদালতগুলোতে বিপুল সংখ্যক মাদক মামলা ঝুলে রয়েছে, যার মধ্যে কেবল রাজধানী ঢাকাতেই পেন্ডিং মামলার সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। বিভিন্ন জেলা আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা যোগ করলে এই জট আরও প্রকট আকার ধারণ করে। প্রথাগত বিচার ব্যবস্থায় এই বিপুল সংখ্যক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা দীর্ঘসাপেক্ষ ও জটিল।

এই বিচারিক স্থবিরতা কাটাতে এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির মুখোমুখি করতে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে প্রচলিত আদালতের পাশাপাশি এখানেও সমান্তরালভাবে মাদক মামলার বিচার কাজ চলবে, যা মামলার জট কমাতে এবং অপরাধীদের মনে আইনগত প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মাদক চোরাচালান দমনের পাশাপাশি আসক্তদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকেও জোরদার করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ১৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। চিকিৎসার আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই কেন্দ্রগুলো চালু হলে সরকারি পর্যায়ে পুনর্বাসন সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগকে টেকসই করতে পর্যায়ক্রমে ৭৩টি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রকে মোট এক কোটি ১০ লাখ টাকা অনুদান প্রদানের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আধুনিকায়ন, বিচার ব্যবস্থার গতিশীলতা এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার এই সমন্বিত উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের মাদক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি সম্ভব।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ