রেজাউল করিম প্লাবন
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। হ্যাটট্রিক বিজয়ের পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একাগ্রচিত্ত ও দূরদর্শিতা এবং উন্নয়ন রাজনীতিসহ মূলত ১০টি বিষয় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে- এমনটি মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।
তাদের মতে, অন্য আটটি বিষয় হচ্ছে- নেতাকর্মীদের আত্মবিশ্বাস ও জোট শরিকদের আন্তরিকতা, দলীয় কোন্দল প্রায় শূন্যতে নিয়ে আসা, বিগত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ফলে দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের আস্থা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জঙ্গিবাদ দমন, মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি, কূটনৈতিক সফলতা, জনপ্রিয় প্রার্থী মনোনয়ন এবং ব্যাপক নির্বাচনী প্রচার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক সোমবার যুগান্তরকে বলেন, এই অভাবনীয় সাফল্যের অন্যতম কারণ আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি মানুষের শতভাগ আস্থা ও বিশ্বাস।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ উন্নয়ন-অগ্রগতির প্রতি এবং সাম্প্রদায়িক-জঙ্গিবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণরায় দিয়েছে। বর্তমান প্রজন্ম যারা প্রথম ভোটার তাদের মধ্যে জাতীয় জাগরণ সৃষ্টি হওয়ায় আওয়ামী লীগের এই গগনচুম্বী বিজয়। এই নিরঙ্কুশ বিজয় প্রমাণ করে শেখ হাসিনার প্রতি দেশের মানুষ শতভাগ আস্থাশীল।
আত্মবিশ্বাস : আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, আত্মবিশ্বাস যে কোনো জাতিকে সুসংগঠিত করে। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিকে সে সময় দায়ী করেছিল দলটির অনেকে।
কিন্তু পর পর দুইবার ক্ষমতায় থাকার কারণে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নেতাকর্মীদের মধ্যে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার আত্মবিশ্বাসের জন্ম হয়। ধরতে গেলে এই নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে প্রায় শতভাগ আশাবাদী ছিল নেতাকর্মীরা।
কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সৃষ্টি হওয়া এই আত্মবিশ্বাস ব্যাপক সাহস জুগিয়েছে। দৃঢ়তার সঙ্গে তা সাধারণ মানুষদের বোঝাতেও সক্ষম হয়েছে। দলীয় সভাপতির একনিষ্ঠতা, দূরদর্শিতা, সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন এবং তা বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা দলকে কঠিন আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলে।
আওয়ামী লীগের এই দৃঢ়চেতা বিশ্বাসের ঢেউ সরকারেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চৌকস নেতৃত্বে প্রশাসনেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি হওয়ায় ভোটের মাঠে জয়ের জন্য বেগ পোহাতে হয়নি আওয়ামী লীগকে।
সুসংগঠিত নেতাকর্মী : নীতিনির্ধারকরা আরও জানান, অন্যান্য বারের নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। বিগত ৫ বছরে দেশের অনেক স্থানে উপজেলা, জেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছে।
এসব নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারণে নিজ দলের প্রার্থীদের পরাজিত হতে হয়েছে। আবার অনেক প্রভাবশালী নেতা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচারণার কাজও করেছেন। দলের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এমন নেতাদের অনেককেই শাস্তি দেয়া হয়েছে।
দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেও কঠোর হস্তে দমন করেছেন অনেককে। গণভবনে ডেকে নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত হওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। এছাড়া দলের বাইরে কাজ করেছেন- এমন অনেক নেতাকে পদপদবি না দেয়া, বলয় সৃষ্টিকারীদের মনোনয়ন বঞ্চিতকরণ, বিশৃঙ্খলাকারীদের একঘরে করাসহ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নানা কৌশলে সংগঠিত হতে বাধ্য হয় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
নির্বাচনের দিন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সুসংগঠিত থাকায় প্রতিপক্ষ তেমন সুবিধা করতে পারেনি। জ্বালাও-পোড়াওসহ তেমন কোনো সহিংসতা করার সাহস করেনি। আওয়ামী লীগের এই সুসংগঠিত নেতাকর্মী জয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
দৃশ্যমান উন্নয়ন : দলটির নীতিনির্ধারকদের অভিমত, বর্তমান সরকারের বিগত ১০ বছরে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের মেগা প্রকল্পগুলো বিশেষ করে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিভিন্ন মহাসড়কে ফোরলেন রাস্তা দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ এখন বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। দুস্থ, অসহায়দের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ ভাতার ব্যবস্থা করেছে। দেশের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি করেছে। দারিদ্র্য ও বেকারত্বের হার কমেছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হওয়ায় একাদশেও আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রেখেছেন ভোটাররা।
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন : ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতির প্রায় পুরোটাই বাস্তবায়ন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রতিশ্রুতির বাইরে অনেক মানবিক প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন করেছেন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সফর করে তাৎক্ষণিকভাবে অনেক বড় বড় সমস্যার সমাধানও করেছেন তিনি। এছাড়া ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুর্নীতি দমন, দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক মুক্তি, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, শিক্ষার অগ্রগতি, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। ফলে ভোটের মাঠে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
জঙ্গিবাদ দমন : এছাড়া আওয়ামী লীগের এই বিশাল জয়ে আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে জঙ্গিবাদ দমন। বিগত ৫ বছরে দেশের বেশ কিছু স্থানে জঙ্গি হামলা হলে তা কঠোরভাবে দমন করে সরকার। এতে দেশে ও দেশের বাইরে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।
বহির্বিশ্বে আওয়ামী লীগের জঙ্গি দমন কার্যক্রম ব্যাপক প্রশংসিত হয়। জঙ্গিবাদ দমনে কঠোরতার কারণে দেশের মানুষ অনেকটাই নিরাপদ ও শান্তিতে ছিল। এতে ইতিবাচক সাড়া পড়েছে ভোটারদের মধ্যে।
মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি : ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের আরও অভিমত, নির্বাচনের আগে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার। অভিভাবক সমাজে এই অভিযান ব্যাপক সমাদৃত হয়।
অভিযানে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক মাদক কারবারি খুন হয়। দেশে নিশ্চিত হয় স্বস্তির পরিবেশ। প্রশাসনের এই কঠোর মাদক দমন নীতির কারণে দেশের মাদকের বিস্তার অনেকাংশেই কমে গেছে।
ব্যাপক প্রচার : এবারের নির্বাচনে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ২০১৮ সালের শুরু থেকেই এই প্রচারণা শুরু করে দলটির নেতাকর্মীরা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে প্রায় একতরফা প্রচারণা ছিল আওয়ামী লীগের।
ডিজিটাল মাধ্যমের পাশাপাশি মাইকিং, পোস্টারিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল উল্লেখ করার মতো। এছাড়া সরকারের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও ও নাশকতার প্রচারও করেছে নেতাকর্মীরা।
এসব প্রচার-প্রচারণা দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে। এবারের নির্বচনী প্রচারে শোবিজ অঙ্গনের তারকারা অংশ নিয়ে ভোটারদের মন জয় করতে পেরেছেন বলে মনে করছেন দলের সংশ্লিষ্টরা।
জোট শরিকদের আন্তরিকতা : নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোট শরিকদের আন্তরিকতা ছিল উল্লেখ করার মতো। মনোনয়ন না পেয়েও মহাজোটের অনেক দল তাদের সাধ্যমতো সারাদেশে জোটের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন-সংগ্রামে জোটবন্ধুদের সার্বক্ষণিক পাশে পেয়েছে আওয়ামী লীগ।
মনোনয়নে জনপ্রিয় প্রার্থী : এবারের নির্বাচনে অধিকাংশ আসনে প্রতিপক্ষ ঐক্যফ্রন্টের চেয়ে জনপ্রিয় ছিল আওয়ামী লীগের প্রার্থী। অনেক স্থানে প্রতিপক্ষ বিএনপির নতুন ও অপরিচিত মুখ প্রার্থী হওয়ায় সেক্ষেত্রে সহজ জয় পেয়েছেন মহাজোটের প্রার্থীরা।
এছাড়া অধিকাংশ আসনে বর্তমান এমপি যারা এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন। একইসঙ্গে তাদের পরিচ্ছন্ন ইমেজের জন্য এবার নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।
কূটনৈতিক সাফল্য : বিগত ৫ বছরে আওয়ামী লীগের কূটনৈতিক সফলতা ছিল আকাশচুম্বী। কোথাও খালি হাতে ফেরেননি দলটির সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি এখন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’, সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রধানমন্ত্রী। বিগত ৫ বছরে অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন তিনি। বিশ্বে এখন ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হচ্ছে বাংলাদেশ।

