অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
কুমিল্লার মুরাদনগরে অবস্থিত শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য চলমান একটি প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। সম্প্রতি জারি করা এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ‘শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের জন্য ওয়েলহেড গ্যাস কম্প্রেসর ক্রয় ও স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটির চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বাপেক্সের পরিচালনায় থাকা শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডটি একটি উৎপাদনশীল গ্যাসক্ষেত্র। এখানে দীর্ঘদিন ধরে চারটি কূপ—কূপ নম্বর ২, ৩, ৪ এবং ইস্ট-১—থেকে গ্যাস উত্তোলন চলছে। সংশ্লিষ্ট কারিগরি নথি অনুযায়ী, টানা উৎপাদনের কারণে এসব কূপের কূপমুখের চাপ ধীরে ধীরে কমে এসেছে। এর ফলে প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টে গ্যাস প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ইনলেট চাপ বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বিক্রয় বা ট্রান্সমিশন লাইনের নির্ধারিত অপারেটিং চাপ ধরে রাখাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে চারটি কূপ যেকোনো সময় উৎপাদন অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে কূপমুখে গ্যাস কম্প্রেসর স্থাপনের মাধ্যমে চাপ পুনরুদ্ধার ও উৎপাদন স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টে গ্যাসের ইনলেট চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি প্ল্যান্ট ও ট্রান্সমিশন লাইনের অপারেটিং ভারসাম্য স্বাভাবিক রাখার সুযোগ তৈরি হতো। একই সঙ্গে বিদ্যমান কূপগুলো থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন নিশ্চিত করা সহজ হতো বলে প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ ছিল।
বাপেক্স সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পটির জন্য পার্চেজ অর্ডার ইস্যু করা হয়। তবে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি চুক্তিটি বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। চুক্তিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এস. সি ইউরো গ্যাস সিস্টেমের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুক্তি বাতিলের ক্ষেত্রে কোনো গ্রহণযোগ্য কারিগরি বা আর্থিক কারণ তাদের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি। তাদের দাবি, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যেই বাস্তবায়নযোগ্য ছিল।
চুক্তিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যমতে, কম্প্রেসর স্থাপনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমএসসিএফডি) অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল। এই অতিরিক্ত উৎপাদন জাতীয় গ্যাস সরবরাহে যুক্ত হলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা আংশিকভাবে কমানো সম্ভব হতো। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জ্বালানি খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনার কথা সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ ছিল।
চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারিত ছিল প্রায় ১৭৮ কোটি টাকা। তবে চুক্তি বাতিলের পর নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হলে প্রকল্প ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ায় গেলে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি নতুন করে দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আড়াই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে, যা প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
চুক্তিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, চলমান প্রকল্পটি অব্যাহত থাকলে এক বছরের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পেত এবং দীর্ঘমেয়াদে শত শত কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতো বলে তারা দাবি করেছে। তবে এ বিষয়ে বাপেক্সের পক্ষ থেকে চুক্তি বাতিলের কারণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের চারটি উৎপাদনশীল কূপের ভবিষ্যৎ এবং জাতীয় গ্যাস সরবরাহে এর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় রেখে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে জ্বালানি খাতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে এই গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ধারাবাহিকতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় এর অবদান।


