জাতীয় ডেস্ক
জাতীয় সংসদে সাউন্ড সিস্টেম বা শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের নামে সংঘটিত বিপুল অঙ্কের আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাহিদুর রহিম জোয়ারদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাকে তলব করে এই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রাষ্ট্রীয় তহবিলের শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে দুদক এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, সংস্থাটির সহকারী পরিচালক প্রবীর দাসের নেতৃত্বে একটি অভিজ্ঞ অনুসন্ধানকারী দল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জাহিদুর রহিম জোয়ারদারকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। জিজ্ঞাসাবাদে মূলত ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের কার্যাদেশ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া, প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ, ধাপে ধাপে বিল উত্তোলন এবং সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির প্রকৃত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের বিষয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। এছাড়া, এই প্রকল্পের মাধ্যমে আত্মসাৎকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডি বা অন্য কোনো অবৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও তাকে সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জাতীয় সংসদের ভেতরে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সেই সময় দরপত্র প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’ এই কাজটি বাগিয়ে নেয় বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের প্রাথমিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি দাম দেখিয়ে সরকারের শত শত কোটি টাকা বিল হিসেবে উত্তোলন করেছে। এছাড়া, চুক্তিতে উল্লেখিত নির্দিষ্ট স্পেসিফিকেশন বা মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতির পরিবর্তে অত্যন্ত নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা সরকারি ক্রয় নীতি বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
দীর্ঘ সময় ধরে এই দুর্নীতির বিষয়টি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় জাতীয় সংসদের বিভিন্ন সংস্কার কাজ শুরু হলে পূর্বের এই আর্থিক অনিয়মগুলো স্পষ্টভাবে সামনে চলে আসে। সংস্কার কাজের সময় সাউন্ড সিস্টেমের বর্তমান জীর্ণ অবস্থা, এর কার্যকারিতা এবং कागজে-কলমে দেখানো ক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়। এর পরপরই বিষয়টি নিয়ে নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলে, গত জানুয়ারি মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘটনার অনুসন্ধানে নামে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ শুরু করে।
দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদে এ ধরনের দুর্নীতির ঘটনা জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সরকারি ক্রয় নীতি লঙ্ঘন করে কীভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এত বড় অঙ্কের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এর নেপথ্যে সংসদ সচিবালয়ের তৎকালীন কোন কোন প্রভাবশালী কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জড়িত ছিলেন, সেটিও এখন দুদকের নিবিড় অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও স্পর্শকাতর পর্যায়ে এ ধরনের আর্থিক অনিয়ম সুশাসনের চরম ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির গভীরতাকেই নির্দেশ করে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা ভবিষ্যতে সরকারি অর্থ তছরুপ রোধে একটি শক্ত বার্তা প্রদান করবে।
দুদকের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদারকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যগুলো বর্তমানে গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। একইসঙ্গে, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের ইতিহাস, মালিকপক্ষের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণী এবং বিদেশে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য রুটগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের আওতায় এই অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানের প্রয়োজনে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য, অডিট কর্মকর্তা এবং সংসদ সচিবালয়ের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করার সম্ভাবনা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থের প্রতিটি পয়সার সঠিক হিসাব নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে দুদক এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করছে বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।


