ল্যস্ফীতিতে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা অর্থ উপদেষ্টার: সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ

ল্যস্ফীতিতে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা অর্থ উপদেষ্টার: সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

পতিত সরকারের রেখে যাওয়া বিশাল মূল্যস্ফীতির প্রভাবে জনজীবনে দুর্ভোগ বৃদ্ধি এবং অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বিকেলে ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় ফরিদপুর অঞ্চলের পাঁচটি জেলার জনপ্রতিনিধি ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তাঁর বক্তব্যে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি বলেন, “বিগত সরকারের ভুল অর্থনৈতিক নীতি ও রেখে যাওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটিয়ে সাধারণ মানুষকে চরম সংকটে ফেলতে পারত, কিন্তু বর্তমান সরকার কৃষক ও সাধারণ জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয় না করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি বৈরী পরিবেশ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণেই সরকার এই কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।

দেশের ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক সংকটের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, অতীতেও যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্ভিক্ষগ্রস্ত অর্থনীতি থেকে দেশ পুনর্গঠনের অভিজ্ঞতা এই সরকারের রয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্টের সময় যেভাবে বৈদেশিক সহযোগিতা ও জনশক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দেশ এগিয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেই দৃঢ়তা নিয়ে সংকট মোকাবিলা করছে। সরকারের লক্ষ্য কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে স্বনির্ভর ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

দেশের আর্থসামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে সর্বজনীন করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। উপদেষ্টা তিতুমীর বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম নারী ও কৃষকদের জন্য এ ধরনের ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের পাঁচটি মূল ভিত্তির ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনরুত্থান, ভঙ্গুর অর্থনীতির সংস্কার এবং আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এখন জাতীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য দূর করতে এই প্রথম কোনো সরকার নির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে, যার অংশ হিসেবে রংপুর ও রাজশাহীর পর ফরিদপুর অঞ্চলে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সভায় অংশ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। শরীয়তপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ জনপ্রতিনিধিদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিটি সংসদীয় আসনে কার্যালয় স্থাপন এবং ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। গোপালগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর অভিযোগ করেন, অতীতে গোপালগঞ্জে নেওয়া প্রকল্পগুলো আয়ের উৎসের পরিবর্তে ভর্তুকিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, জেলাটি বর্তমান সরকারের আমলে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে বিলম্ব হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সাধারণ শিক্ষার সাথে মাদরাসা শিক্ষার সমন্বয়ের দাবি জানান। ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা কৃষিখাতের সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, কৃষি উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সিন্ডিকেট প্রথা ভাঙা জরুরি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, জ্বালানি তেল নিয়ে কিছু অসাধু চক্র সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় অন্যদের মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ, মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহান্দার আলীসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে উপদেষ্টা মহোদয় সমতাভিত্তিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রাপ্ত প্রস্তাবনাগুলো জাতীয় নীতিতে প্রতিফলিত করার আশ্বাস দেন।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ