কয়লা আমদানিতে অনিয়মের অভিযোগ: শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রী ও সচিবের পদত্যাগ

কয়লা আমদানিতে অনিয়মের অভিযোগ: শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রী ও সচিবের পদত্যাগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিম্নমানের কয়লা আমদানির অভিযোগে সৃষ্ট তীব্র জনরোষ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগ করেছেন শ্রীলঙ্কার জ্বালানি মন্ত্রী কুমারা জয়াকোডি এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব উদয়াঙ্গা হেমাপালা। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দেশটির প্রেসিডেন্টের গণমাধ্যম দপ্তর থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বচ্ছ তদন্তের স্বার্থে তারা স্বেচ্ছায় পদ ছেড়েছেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট দপ্তরের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শুক্রবার সকালে মন্ত্রী কুমারা জয়াকোডি এবং সচিব উদয়াঙ্গা হেমাপালা প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের কাছে তাদের পদত্যাগপত্র জমা দেন। মূলত নিম্নমানের কয়লা আমদানির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষতি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটানোর যে অভিযোগ উঠেছে, তার একটি নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কুমারা জয়াকোডি বর্তমান সরকারের প্রথম কোনো শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী, যিনি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর পদত্যাগ করলেন।

জ্বালানি মন্ত্রীর এই আকস্মিক পদত্যাগের পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন। তিনি দাবি করেন, সরকার কোনো তথ্য গোপন করার চেষ্টা করছে না এবং পুরো ক্রয় প্রক্রিয়ায় যথাযথ নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, “জ্বালানি মন্ত্রীর সরাসরি সম্পৃক্ততায় কোনো জালিয়াতি বা দুর্নীতির প্রমাণ এখনও মেলেনি। তবে জনমনে সৃষ্ট সংশয় দূর করতে এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।” সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই তদন্ত কার্যক্রম আগামী ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে সংসদে কুমারা জয়াকোডির বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো একটি অনাস্থা প্রস্তাব আনলে তা ভোটাভুটিতে পরাজিত হয়। তবে জনরোষ কমেনি এবং সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে অব্যাহত চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তাকে সরে দাঁড়াতে হলো। প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকে পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের জন্য আমদানিকৃত সকল কয়লা ক্রয়ের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

শ্রীলঙ্কার গুরুত্বপূর্ণ লাকভিজয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে দেশটিতে দীর্ঘকাল ধরে উদ্বেগ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট এর আগে স্বীকার করেছিলেন যে, নিম্নমানের কয়লা সরবরাহের কারণে এই রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির যান্ত্রিক গোলযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত একটি বিশেষ নিরীক্ষা (Special Audit) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শ্রীলঙ্কার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করে এই লাকভিজয়া কেন্দ্রটি। পূর্ণ সক্ষমতায় কেন্দ্রটি সচল রাখতে বছরে গড়ে ২২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা প্রয়োজন হয়।

গত মাসে দেশে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিলে ঘাটতি পূরণে সরকার জরুরি ভিত্তিতে ৩ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানি করেছিল। সেই আমদানিকৃত কয়লার মান এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ ঘিরেই বর্তমান সংকটের সূত্রপাত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দ্বীপরাষ্ট্রটির জন্য এই রাজনৈতিক অস্থিরতা বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পথে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকের এই কঠোর অবস্থান এবং তদন্তের নির্দেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ