স্টিভেন স্পিলবার্গের নতুন সিনেমা ‘ডিসক্লোজার ডে’: সৃজনশীল সংকটে হলিউডকে সতর্কবার্তা

স্টিভেন স্পিলবার্গের নতুন সিনেমা ‘ডিসক্লোজার ডে’: সৃজনশীল সংকটে হলিউডকে সতর্কবার্তা

বিনোদন ডেস্ক

বিশ্ব চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গ হলিউডের বর্তমান গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি লাস ভেগাসে আয়োজিত ‘সিনেমাকন’ উৎসবে উপস্থিত হয়ে তিনি সতর্ক করেছেন যে, সৃজনশীলতার অভাব এবং শুধুমাত্র পরিচিত গল্পের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা চলচ্চিত্র শিল্পকে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই উৎসবেই তিনি তাঁর আসন্ন সায়েন্স-ফিকশন চলচ্চিত্র ‘ডিসক্লোজার ডে’-র প্রথম ঝলক উন্মোচন করেন।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলচ্চিত্রকে বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এই নির্মাতা মনে করেন, হলিউড বর্তমানে ঝুঁকিহীন বিনিয়োগের পেছনে ছুটছে। প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড এবং একই ধাঁচের সিক্যুয়েলের পুনরাবৃত্তি শিল্পের মৌলিকত্ব নষ্ট করছে। স্পিলবার্গের মতে, দর্শককে চমকে দেওয়ার ক্ষমতা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অভাব দেখা দিলে সিনেমার ‘সৃজনশীল জ্বালানি’ দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।

সিনেমাকনে প্রদর্শিত ‘ডিসক্লোজার ডে’র সংক্ষিপ্ত চিত্রায়ন থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, স্পিলবার্গ আবারও তাঁর সেই চিরচেনা রহস্য ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণে ফিরে এসেছেন। যদিও ছবির মূল কাহিনি এখনো গোপন রাখা হয়েছে, তবে প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী এটি ভিনগ্রহের প্রাণী এবং সেই সংক্রান্ত সত্য ধামাচাপা দেওয়ার সরকারি ষড়যন্ত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এর আগে ‘ই.টি. দ্য এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল’ বা ‘ক্লোজ এনকাউন্টারস অব থার্ড কাইন্ড’-এর মাধ্যমে তিনি এই ঘরানার চলচ্চিত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তবে বর্তমান সময়ের উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর দর্শকদের কাছে এই পুরোনো জাদু কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে।

ছবিটির কলাকুশলী তালিকায় যুক্ত হয়েছেন একঝাঁক তারকা। এতে একজন আবহাওয়া সংবাদকর্মীর চরিত্রে অভিনয় করছেন এমিলি ব্লান্ট, যাঁর মাধ্যমে ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগের যোগসূত্র তৈরি হবে। জশ ও’কনরকে দেখা যাবে প্রমাণের সন্ধানে থাকা এক ব্যক্তির চরিত্রে এবং কলিন ফার্থ অভিনয় করছেন সত্য গোপনকারী এক ক্ষমতাধর প্রশাসনিক কর্মকর্তার ভূমিকায়। সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছেন ডেভিড কোয়েপ, যিনি এর আগে ‘জুরাসিক পার্ক’-এর মতো কালজয়ী সিনেমার চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন।

স্পিলবার্গের এই নতুন প্রজেক্টটি কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং হলিউডের বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ধরনের সৃজনশীল প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে বড় বাজেটের ছবিগুলো কেবল নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৃজনশীলতার ক্ষেত্রটি সংকুচিত হওয়ায় মৌলিক গল্পের পরিবর্তে ফ্র্যাঞ্চাইজি বা পরিচিত চরিত্রের ওপর ভর করে ব্যবসা করার প্রবণতা বাড়ছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

চলচ্চিত্রের প্রদর্শন ব্যবস্থা নিয়েও স্পিলবার্গ তাঁর সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সিনেমা হলের বড় পর্দা এবং সম্মিলিত দর্শক প্রতিক্রিয়াই চলচ্চিত্রের প্রকৃত প্রাণ। কিন্তু স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম বা ওটিটির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ফলে ছবিগুলো খুব দ্রুত প্রেক্ষাগৃহ থেকে বিদায় নিচ্ছে। এতে সিনেমা দেখার মৌলিক অভিজ্ঞতা ব্যাহত হচ্ছে। প্রযোজনা সংস্থা ‘ইউনিভার্সাল পিকচার্স’ প্রেক্ষাগৃহে দীর্ঘ সময় প্রদর্শনের যে নীতি গ্রহণ করেছে, তাকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি অন্য সংস্থাগুলোকেও একই পথ অনুসরণের আহ্বান জানান।

বিগত কয়েক বছরে স্পিলবার্গ ‘দ্য ফ্যাবেলম্যানস’ বা ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’র মতো তুলনামূলক ব্যক্তিগত ও ক্ল্যাসিক আবহের ছবি নির্মাণ করেছেন। তবে ‘ডিসক্লোজার ডে’র মাধ্যমে তিনি আবারও বৃহৎ প্রেক্ষাপটের রহস্যময় জগতে ফিরছেন। বিশ্ব চলচ্চিত্রের এই সংকটময় মুহূর্তে স্পিলবার্গের এই নতুন উদ্যোগ এবং হলিউড নিয়ে তাঁর সতর্কবার্তা কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা দেখার অপেক্ষায় আছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রেক্ষাগৃহে ফিরলে দর্শক কি সেই চিরাচরিত স্পিলবার্গীয় বিস্ময় খুঁজে পাবে, নাকি ডিজিটাল যুগে চলচ্চিত্রের ভাষা আমূল বদলে যাবে—এই বিতর্কই এখন চলচ্চিত্র পাড়ায় মুখ্য হয়ে উঠেছে।

বিনোদন শীর্ষ সংবাদ