রাজনীতি ডেস্ক
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে দেশব্যাপী ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে গঠিত এই নতুন দলটি এখন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিজেদের পতাকাতলে আনার কৌশল গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে বড় দলগুলোর বঞ্চিত, নিষ্ক্রিয় বা আদর্শিক দ্বন্দ্বে থাকা অংশকে দলে ভেড়াতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এনসিপির নীতিনির্ধারকরা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ এবং এসব দলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক ও বর্তমান কর্মীদের টার্গেট করছে এনসিপি। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা দলটি অতি অল্প সময়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ছয়টি আসনে জয়লাভের পর এখন নিজেদের প্রভাব বলয় আরও বিস্তৃত করতে চায়।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এ প্রসঙ্গে বলেন, “যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে দীর্ঘ সময় নির্যাতিত হয়েছেন এবং গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন ছিলেন, আমরা তাদের একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই। বিএনপি বা এবি পার্টির মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং অনেকে যোগদানও করেছেন। এই প্রক্রিয়াটি একটি চলমান কর্মসূচি হিসেবে অব্যাহত থাকবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারাও ক্রমান্বয়ে এনসিপিতে যুক্ত হচ্ছেন।
তবে দল গঠনের ক্ষেত্রে এনসিপি একটি কঠোর নীতি অনুসরণ করছে। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অতীত বা বর্তমানে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও কোনো ধরনের সহিংসতার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের জন্য এনসিপির দরজা বন্ধ। স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অধিকারীদেরই কেবল সদস্যপদ দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এবং ইউনাইটেড পিপলস (আপ) বাংলাদেশের প্রায় ৪৫ জন নেতাকর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আপ বাংলাদেশের আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, মুখ্য সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত এবং মুখপাত্র শাহরিন সুলতানা ইরা। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ ও দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেনসহ বেশ কয়েকজন উল্লেখযোগ্য মুখ এনসিপির পতাকা গ্রহণ করেছেন।
এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দলের এই বিস্তার নীতিকে সময়োপযোগী বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আমরা যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে নেমেছিলাম, সেই শক্তিকে এখন একটি টেকসই রাজনৈতিক কাঠামোর রূপ দিতে হবে। দেশে বর্তমানে একটি বিকল্প এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন। কে আগে কোন সংগঠনে ছিল সেটি বড় কথা নয়; যারা এনসিপির আদর্শ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ধারণায় বিশ্বাস করবে, তাদের নিয়েই আমরা এগিয়ে যাব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি মূলত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির বিদ্রোহী ও বঞ্চিত প্রার্থীদের নিজেদের দিকে টানার কৌশল নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দলের শীর্ষ নেতারা আলোচিত কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন। ছাত্রদল ও যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা এবং ঢাকা-৭ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসহাক সরকার এনসিপিতে যোগদানের বিষয়ে ইতিবাচক সংকেত দিয়েছেন। দীর্ঘদিন কারাবরণ ও রাজনৈতিক মামলার শিকার এই নেতা অভিযোগ করেছেন, নিজ দলের কাছ থেকে মূল্যায়ন না পাওয়ায় তিনি জনসেবার লক্ষ্যে বিকল্প প্ল্যাটফর্ম খুঁজছেন। তাকে এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এদিকে বিএনপির সাবেক নেত্রী ও সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এনসিপিতে যোগদানের খবর নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চললেও তিনি বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। রুমিন ফারহানা জানিয়েছেন, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এনসিপিসহ বিভিন্ন দল তাকে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি এবং বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া খবরগুলো ভিত্তিহীন।
নবগঠিত এই রাজনৈতিক দলটি কি প্রথাগত ধারার বাইরে এসে নতুন কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দেবে, নাকি কেবল অন্য দলের কর্মীদের সমাহার ঘটিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করবে—তা নিয়ে বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক মহলে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব পক্ষকে এক ছাতার নিচে আনার যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এনসিপি নির্ধারণ করেছে, তার সফলতার ওপরই নির্ভর করছে দলটির ভবিষ্যৎ অবস্থান। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে জেলা পর্যায়ের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার মধ্য দিয়ে দলটি তাদের পূর্ণ শক্তির জানান দিতে চায়।


