আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলো থেকে সংগৃহীত ফি বা টোলের প্রথম দফার অর্থ নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা করেছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের দ্বিতীয় ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবাই এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করেছে তেহরান, যা দেশটির জাতীয় রাজস্বে নতুন আয়ের উৎস হিসেবে যুক্ত হলো।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ওমান ও ইরানকে পৃথককারী এই সংকীর্ণ জলপথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত। তেহরানের দাবি, আন্তর্জাতিক এই নৌপথে চলাচলকারী ভেসেলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জলসীমার রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ এই ফি ধার্য করা হয়েছে। সংগৃহীত অর্থ সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোষাগারে জমা হওয়াকে দেশটির অর্থনৈতিক কৌশলের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন স্থানীয় নীতিনির্ধারকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধের মুখে থাকা তেহরান নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখতে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছে। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সেখান থেকে রাজস্ব আদায় সেই পরিকল্পনারই প্রতিফলন।
তবে ইরানের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল আইন এবং সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত কনভেনশনগুলোর সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ চলাচলের অধিকার রক্ষায় বিশেষ নীতিমালা থাকলেও ইরান নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা সেবার দোহাই দিয়ে এই টোল আদায় করছে। এর ফলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের বিদ্যমান উত্তজনা নতুন মাত্রা পেতে পারে।
বিশেষ করে পারস্য উপসাগর দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা ও নেভিগেশনাল সুবিধার নামে এই অর্থ আদায়কে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। ওয়াশিংটন এবং তার মিত্র দেশগুলো এই পদক্ষেপকে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করতে পারে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য এই রুটটি অপরিহার্য হওয়ায়, টোল আদায়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তেহরান স্পষ্ট করেছে যে, এই রাজস্ব তাদের জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। অবরোধের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে থাকা দেশটির জন্য এই তহবিল একটি বড় স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে।


