রাজনৈতিক ডেস্ক
বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) মুহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম বলেছেন, দেশের জনজীবন যখন নানাবিধ সংকটে বিপর্যস্ত, তখন সরকার জনস্বার্থ উপেক্ষা করে দমনমূলক নীতি গ্রহণ করছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ হলে ছাত্রসমাজ আবারও রাজপথে কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।
শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে ছাত্র নেতারা তাদের অবস্থান তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শুরুতেই জকসু ভিপি মুহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম সরকারের বর্তমান অবস্থানকে ‘বিপথগামী’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী যখনই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, তখনই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। নব্বইয়ের দশকে সারের দাবিতে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এর তুলনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং গ্যাসের তীব্র সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন আজ ধ্বংসের মুখে। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংক খাত দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ছাত্রনেতা রিয়াজুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, সরকার তাদের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা আড়াল করতে ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হওয়ার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ। তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, “জুলাই বিপ্লবীদের রক্ত ও জুলাই সনদকে অবজ্ঞা করলে দেশে আবারও ‘জুলাই বসন্ত’ বা গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হবে। তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নামলে সরকার পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।”
একই সমাবেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতায় রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের কর্মকাণ্ডে শহীদদের ত্যাগের প্রতি অবমাননা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক কার্যালয় পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং ছাত্র রাজনীতিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের প্রচেষ্টাকে তিনি ‘শহীদদের সঙ্গে বেইমানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
মাজহারুল ইসলাম বিদেশি প্রেসক্রিপশনে দেশ চালানো বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গণভোটের রায়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি মনে করেন, সরকার যদি দ্রুত জুলাই সনদ ও গণভোটের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারে কার্যকর ভূমিকা না রাখে, তবে ছাত্রসমাজ পুনরায় জেগে উঠবে। তার মতে, পূর্ববর্তী সরকারের পতনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান প্রশাসনের উচিত জনদাবি মেনে নিয়ে দ্রুত সুষ্ঠু ধারায় ফিরে আসা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র সংসদের নেতাদের এই কড়া বার্তা সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তরুণ প্রজন্মের যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলনই এই ছাত্র নেতাদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জ্বালানি সংকটের মতো জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলো নিয়ে ছাত্র সমাজের এই অবস্থান আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সমাবেশ থেকে ছাত্র নেতারা অবিলম্বে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। অন্যথায় সারা দেশে ছাত্র-জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে তারা সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।


