আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতা ঘোষণার পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বিমান ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। বুধবার লেবাননের একাধিক কৌশলগত অঞ্চলে নতুন করে এই সামরিক অভিযান চালানো হয়। এতে যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্থায়ীত্ব নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এলাকা এবং এর সীমান্তবর্তী কফার তেবনিত শহরের পূর্বাঞ্চলে তীব্র বিমান হামলা চালিয়েছে। এর পাশাপাশি জাহরানি এলাকার আনসারিতে চালকবিহীন ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। গত সোমবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে একটি সমঝোতা স্মারক (স্মারক চুক্তি) স্বাক্ষরের পর সার্বিক সহিংসতা কিছুটা হ্রাস পেলেও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করেনি। চুক্তি-পরবর্তী এই ৪৪ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
সহিংসতার তীব্রতা কিছুটা কমায় গত কয়েকদিনে দক্ষিণ লেবাননের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের একটি অংশ নিজেদের ঘরবাড়ি ও গ্রামে ফিরে পরিস্থিতি মূল্যায়নের চেষ্টা করছিলেন। তবে লেবাননের জাতীয় সেনাবাহিনী (এলএএফ) বেসামরিক নাগরিকদের এখনই উপদ্রুত সীমান্ত এলাকায় না ফেরার জন্য কঠোর সতর্কতা জারি করেছে। সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে যেকোনো সময় পুনরায় বড় ধরনের হামলা কিংবা চুক্তি লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরুতে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ওলটপালট হয়ে যায়। এর প্রতিশোধ নিতে ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ব্যাপক রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করলে লেবানন এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অংশীদারে পরিণত হয়। জবাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবাননজুড়ে তীব্র বিমান হামলা ও দক্ষিণ সীমান্তে স্থল অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির একটি রূপরেখা তৈরি হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বাদানুবাদ চলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইসরায়েলি বাহিনীকে লেবাননের দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এই সংকটের টেকসই বা পূর্ণাঙ্গ সমাধান সম্ভব নয়। চুক্তি লঙ্ঘন করে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপকে তেহরান কঠোরভাবে মোকাবিলা করবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তেল আবিবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিজস্ব অবস্থানে অনড় থেকে জানান, কৌশলগত প্রয়োজন যতদিন থাকবে, ততদিন ইসরায়েলি সেনারা লেবানন ও সীমান্ত অঞ্চলের তথাকথিত ‘নিরাপত্তা জোনে’ অবস্থান করবে।
এদিকে মাঠপর্যায়ের সামরিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চুক্তি ঘোষণার পর থেকে হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি কোনো লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে পাল্টা কোনো হামলা চালায়নি। তবে সংগঠনের ভবিষ্যৎ রণকৌশল ও যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে বুধবার হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেমের একটি পূর্বনির্ধারিত টেলিভিশন ভাষণের কথা রয়েছে, যার ওপর পুরো অঞ্চলের পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৮২৬ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহতের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে। ধসে পড়া ভবন ও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনো বেসামরিক মানুষের মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছেন স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা, ফলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।


