রুয়েটে দেয়াললিখন ও ব্যানার পোড়ানোকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে উত্তেজনা: ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে অনড় শিক্ষার্থীরা

রুয়েটে দেয়াললিখন ও ব্যানার পোড়ানোকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে উত্তেজনা: ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে অনড় শিক্ষার্থীরা

শিক্ষা ও ক্যাম্পাস ডেস্ক

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) ক্যাম্পাসে দেয়াললিখন এবং ব্যানার পোড়ানোকে কেন্দ্র করে গভীর রাতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্ররাজনীতি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে দফায় দফায় মিছিল ও পাল্টাপাল্টি স্লোগানকে কেন্দ্র করে এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ সোমবার দুপুরে ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রুয়েট প্রশাসন ক্যাম্পাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে সম্প্রতি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে ‘গুপ্ত রাজনীতির’ বিরুদ্ধে দেয়াললিখন করা হলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে গতকাল রোববার বিকেলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে একদল শিক্ষার্থী প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের রাজনীতির বিরোধিতা করে পাল্টা দেয়াললিখন করেন এবং কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে একটি প্রতিবাদী ব্যানার টাঙান। অভিযোগ উঠেছে, বিকেলেই ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষার্থী সেই ব্যানারটি ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

ব্যানার পোড়ানোর খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধে। এর জেরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাত দেড়টার দিকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হলের সামনে পৌঁছালে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া ৩০-৩৫ জন ছাত্রদল-সমর্থিত শিক্ষার্থী দলীয় স্লোগান দিতে শুরু করলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতিবিরোধী স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানান। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে রাত ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে মিছিলকারীরা স্থান ত্যাগ করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

ক্যাম্পাসের প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, রুয়েটে বর্তমানে কোনো ছাত্র সংগঠনের প্রকাশ্য কমিটি বা কার্যক্রম নেই। তবে বিভিন্ন নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অপ্রকাশ্য সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ছাত্রদল তাদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিশেষ কিছু ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আধিপত্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা রুয়েটকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন হিসেবে দেখতে চাই। এখানে কোনো ধরনের প্রকাশ্য বা গুপ্ত রাজনীতির স্থান নেই। ব্যানার পোড়ানোর মাধ্যমে আমাদের মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

এদিকে ‘রুয়েট জাতীয়তাবাদী স্পন্দন’ নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে ব্যানার পোড়ানোর ঘটনার পর বিভিন্ন পোস্ট প্রচার করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়। আন্দোলনকারীরা জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বর্তমানে ক্যাম্পাসের ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তারা আজ দুপুরে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাবেন।

পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে রুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক রবিউল ইসলাম সরকার বলেন, “শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে উত্তেজনার বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কিছু কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা বিনষ্ট করছে। গতকাল রাতের ঘটনার পর আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

বর্তমানে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসন ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেবে, ততক্ষণ তাদের আন্দোলন চলবে। অন্যদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার এবং শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে আজকের ঘোষিত অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

রাজনীতি সারাদেশ