গণঅভ্যুত্থানকালীন হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ইনুর পক্ষে পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন

গণঅভ্যুত্থানকালীন হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ইনুর পক্ষে পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন

আইন ও বিচার ডেস্ক

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে দীর্ঘ সময় ধরে আইনি বিতর্ক চলে।

মঙ্গলবার শুনানির শুরুতে হাসানুল হক ইনুকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এ সময় আদালত চত্বরে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেখা যায়। ট্রাইব্যুনালের নির্ধারিত কক্ষে আসামিপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। তার সঙ্গে সহায়তায় ছিলেন অ্যাডভোকেট সিফাত মাহমুদ শুভ ও আবুল হাসান। আসামিপক্ষ প্রসিকিউশনের আনা প্রতিটি অভিযোগ খণ্ডন করার লক্ষ্যে তাদের আইনি ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

প্রতিরক্ষামূলক যুক্তিতে আইনজীবীরা দাবি করেন, কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হতাহতের ঘটনার সাথে সরাসরি হাসানুল হক ইনুর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং প্রসিকিউশন যেসব তথ্য-প্রমাণ হাজির করেছে তা আইনের দৃষ্টিতে দুর্বল। তারা অভিযোগগুলোর বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং দাবি করেন যে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ সময় ইনুর আইনজীবীরা বিগত দিনের অসমাপ্ত যুক্তিতর্কগুলো ক্রমান্বয়ে আদালতের সামনে তুলে ধরেন।

অন্যদিকে, প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সোবহান তরফদার এবং মামুনুর রশিদ। তারা আসামিপক্ষের যুক্তির বিপরীতে রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান তুলে ধরেন। প্রসিকিউটররা আদালতকে জানান, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর হামলার নির্দেশদাতা এবং উস্কানিদাতা হিসেবে হাসানুল হক ইনুর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। ছয়জনকে হত্যার নেপথ্যে যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে, তা দালিলিক প্রমাণের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

২৪ জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে সারা দেশে বিগত সরকারের মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়। কুষ্টিয়া জেলায় আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে এবং আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয়ভাবে মামলা হলে পরবর্তীতে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের আবেদন জানানো হয়। ট্রাইব্যুনাল প্রাথমিক তদন্ত সাপেক্ষে অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই মামলাটি জাতীয় পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এটি উচ্চপর্যায়ের কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে চলা অন্যতম প্রধান বিচারিক কার্যক্রম। মঙ্গলবারের শুনানি শেষে আদালত পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন, যেখানে অবশিষ্ট যুক্তিতর্ক এবং সাক্ষ্য প্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের আচরণ নিয়ে কিছুটা গুঞ্জন সৃষ্টি হলেও আইনি প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে চলমান রয়েছে। সাধারণ নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীদের নজর এখন ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায়ের দিকে। এই মামলার রায় জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ