জাতীয় ডেস্ক
রাজধানীর যানজটপূর্ণ সড়কে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার সকালে নিজের রাষ্ট্রীয় গাড়িবহরের প্রটোকল শিথিল করে একটি অসুস্থ রোগী বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্সকে আগে যাওয়ার সুযোগ করে দেন তিনি। প্রথাগত ভিভিআইপি নিরাপত্তার কড়াকড়ি উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীর এমন মানবিক সিদ্ধান্ত জনমনে ইতিবাচক সাড় ফেলেছে।
ঘটনাটি ঘটে বুধবার সকাল ৯টার কিছু সময় আগে। প্রধানমন্ত্রী যখন বনানী থেকে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে কারওয়ান বাজার এফডিসি মোড় দিয়ে বাংলাদেশ সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ের অভিমুখে যাচ্ছিলেন, তখন এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে সাধারণ যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়। তবে এদিন কারওয়ান বাজার প্রান্তে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয় যে, তার গাড়িবহরের ঠিক পেছনেই একটি অ্যাম্বুল্যান্স সাইরেন বাজিয়ে জরুরিভিত্তিতে পথ পাওয়ার চেষ্টা করছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে তার নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন বহর থামিয়ে বা গতি কমিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সটিকে দ্রুত পার হওয়ার জায়গা করে দিতে। সরকারপ্রধানের সরাসরি নির্দেশনা পাওয়ার পর নিরাপত্তা প্রটোকল ভেঙে অ্যাম্বুল্যান্সটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দেওয়া হয়। ফলে যানজটের শঙ্কা এড়িয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ পায় জরুরি সেবার গাড়িটি।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সূত্রে জানা গেছে, প্রথাগতভাবে বাংলাদেশে ভিভিআইপি চলাচলের সময় সাধারণ মানুষকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হয়। বিশেষ করে জরুরি সেবার যানবাহনগুলোকেও অনেক সময় নিরাপত্তা বলয়ের কারণে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণের পর থেকেই নাগরিক ভোগান্তি লাঘবে প্রটোকল সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের আভাস দিয়ে আসছিলেন। বুধবারের এই ঘটনা সেই প্রতিশ্রুতিরই একটি বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এমন আচরণ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি জনপ্রশাসনে জনসেবামূলক মানসিকতার একটি শক্তিশালী বার্তা। সাধারণত উন্নত বিশ্বে এ ধরনের নজির দেখা গেলেও দেশের প্রেক্ষাপটে এটি বিরল। প্রটোকলের চেয়ে সাধারণ মানুষের জীবন ও জরুরি প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়ার এই মানসিকতা রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে।
এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ। পথচারী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে স্বতঃস্ফূর্ত ও সংবেদনশীল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, জরুরি মুহূর্তে সেকেন্ডের ব্যবধানে একজন রোগীর জীবন-মরণ নির্ধারিত হতে পারে। একজন প্রধানমন্ত্রী হয়েও সেই অতিপ্রয়োজনীয় সময়টুকুর মূল্য দেওয়া নাগরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার বহিঃপ্রকাশ।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা প্রটোকল ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। ভিভিআইপি নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষের মৌলিক চলাচলের অধিকার যেন বিঘ্নিত না হয় এবং অ্যাম্বুল্যান্স বা ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবাগুলো যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে, সে বিষয়ে একটি স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়নের পথ সুগম করবে এই দৃষ্টান্ত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ‘জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস’—এই নীতিকে সামনে রেখে প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। আজকের এই মানবিক দৃষ্টান্তটি সেই বৃহৎ পরিকল্পনারই একটি অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সরকারি কার্যক্রমে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার যে সংস্কৃতি তিনি গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, তা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শিষ্টাচারে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।


