আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ল্যাটিন আমেরিকার উপকূলে সন্দেহভাজন মাদক চোরাচালানকারী নৌকা লক্ষ্য করে গত দুই দিনে মার্কিন বাহিনীর পৃথক দুটি হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলটিতে পরিচালিত ধারাবাহিক অভিযানে নিহতের মোট সংখ্যা বেড়ে এখন ১৯০ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে এই অভিযানের যৌক্তিকতা এবং বেসামরিক জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (সাউথকম) এর পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, গত মঙ্গলবার পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একটি নৌকায় প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়। সাউথকমের দাবি, নৌকাটি একটি ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংগঠনের’ মালিকানাধীন ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, সংশ্লিষ্ট নৌকাটি মাদক পাচারের সুপরিচিত রুট ব্যবহার করছিল এবং এটি সরাসরি মাদক চোরাচালান কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ছিল বলে তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। মঙ্গলবারের অভিযানে নৌকাটিতে থাকা তিনজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন, যাদের ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেছে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ।
এর আগে গত সোমবার ক্যারিবীয় সাগর এলাকায় পরিচালিত অপর এক অভিযানে আরও দুইজন নিহত হন। সাউথকমের তথ্য অনুযায়ী, ওই নৌকাটিও সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছিল। ওয়াশিংটন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ল্যাটিন আমেরিকায় সক্রিয় মাদকচক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং একে ‘মাদক-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
তবে মার্কিন বাহিনীর এই ক্রমাগত সামরিক অভিযান নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞ মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যেসব নৌকা বা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এই ভয়াবহ বিমান হামলা চালাচ্ছে, তাদের অপরাধের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অকাট্য বা প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সরাসরি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো এই হামলাগুলো কতটুকু আইনানুগ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।
সমালোচকদের মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়াই এভাবে সামরিক শক্তি প্রয়োগের ফলে নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে মাছ ধরার নৌকা বা সাধারণ বাণিজ্যিক নৌযান ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামলার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পেন্টাগনের পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা ১৯০ জনে পৌঁছানোয় এই অভিযানের ভয়াবহতা ও বিস্তৃতি নিয়ে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যেও এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে।
পটভূমি হিসেবে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরেই দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা থেকে উত্তর আমেরিকায় মাদক প্রবেশের পথগুলো বন্ধ করতে সামরিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে আসছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদে এই তৎপরতা আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাউথকমের দাবি, তারা কেবল সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং ল্যাটিন আমেরিকার অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা মাদক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
বিপরীতে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের তোয়াক্কা না করে বা আন্তর্জাতিক জলসীমায় একক আধিপত্য বজায় রেখে এ ধরনের হামলা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক সংঘাতকে উস্কে দিতে পারে। নিহতদের পরিচয় ও তাদের অপরাধের সপক্ষে প্রমাণ জনসমক্ষে না আনা পর্যন্ত এই অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় আগামী দিনগুলোতে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা আলোচনার দাবি আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


