বিনোদন ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির এক মাস পেরিয়ে গেলেও সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ ও উন্মাদনা অব্যাহত রয়েছে। ২৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বাজেটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী ৬৪১ মিলিয়ন ডলার আয় করে চলতি বছরের সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্রের তালিকায় তৃতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওজের ব্যানারে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি স্টুডিওর ইতিহাসে বাণিজ্যিকভাবে সফলতম চলচ্চিত্রের মর্যাদা পেয়েছে। শুরুতে ধীরগতিতে যাত্রা শুরু করলেও দর্শক ও সমালোচকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় এটি ‘স্লিপার হিট’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জনপ্রিয় লেখক অ্যান্ডি উইয়ারের সমনামের বেস্টসেলার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন বিখ্যাত পরিচালক জুটি ফিল লর্ড ও ক্রিস্টোফার মিলার। এর আগে উইয়ারের ‘দ্য মার্শিয়ান’ উপন্যাসটিও চলচ্চিত্রে রূপান্তর হয়ে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিল। ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ মূলত মহাকাশ অভিযান এবং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের এক জটিল রসায়নকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছে।
চলচ্চিত্রটির গল্পের শুরু হয় এক রোমহর্ষক অনিশ্চয়তা দিয়ে। মহাকাশযানের ভেতর হঠাৎ সংজ্ঞা ফিরে পান মূল চরিত্র গ্রেস (রায়ান গসলিং)। সাময়িকভাবে স্মৃতিভ্রষ্ট গ্রেস তার চারপাশের মৃত দুই সহযাত্রীকে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েন। অসরলরৈখিক বা নন-লিনিয়ার গল্প বলার কৌশলে ফ্ল্যাশব্যাকে দর্শক জানতে পারেন, গ্রেস আসলে একজন হাইস্কুল শিক্ষক এবং সাবেক মলিকুলার বায়োলজিস্ট। সূর্যের ভেতরে ‘অ্যাস্ট্রোফেজ’ নামক এক অজানা সংক্রমণের ফলে পৃথিবী যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন নাসা এই বিশেষ মিশনের পরিকল্পনা করে। সূর্য নিভে যাওয়ার হুমকিতে পৃথিবীর জীবনাবসান ঠেকানোর শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে ‘হেইল মেরি’ মিশন পরিচালিত হয়।
গল্পের নাটকীয় মোড় আসে যখন মহাকাশে গ্রেসের সাথে এক ভিনগ্রহের প্রাণীর সাক্ষাৎ ঘটে। ভিনগ্রহের এই বন্ধুর সাথে যোগাযোগের ভাষা রপ্ত করে পৃথিবীকে রক্ষা করার অসম লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন গ্রেস। বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণ ও মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের এই মিশ্রণ দর্শকদের আবেগপ্রবণ করে তুলেছে। বিশেষ করে রায়ান গসলিংয়ের একক অভিনয় এবং ভিনগ্রহের প্রাণী রকির সাথে তার বন্ধুত্বের রসায়ন চলচ্চিত্রটির প্রাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে চলচ্চিত্রটি সমালোচনা থেকেও সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিটের দীর্ঘ স্থায়িত্ব এবং কিছু অংশে বৈচিত্র্যের অভাব নিয়ে অনেক সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে মহাকাশের বিশালতা ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে অতিরিক্ত ভিজ্যুয়াল এফেক্ট ও উচ্চকিত শব্দের ব্যবহার অনেক সময় গল্পের স্বাভাবিক আবেদনকে ছাপিয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া ইভা স্ট্র্যাট চরিত্রে সান্ড্রা হুলারের একটি পূর্ণাঙ্গ গান পরিবেশনার দৃশ্যটি গল্পের মূল গতির সাথে কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হয়েছে।
কারিগরি দিক থেকে চলচ্চিত্রটি হলিউডের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দেয়। অস্কারজয়ী চিত্রগ্রাহক গ্রেগ ফ্রেজার মহাকাশের নির্জনতা ও একাকিত্বকে ক্যামেরার ফ্রেমে অসাধারণ নৈপুণ্যে তুলে ধরেছেন। পাল ল্যামবার্টের ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট এবং ড্যানিয়েল পেম্বারটনের আবহসংগীত সিনেমাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছে। ড্যানিয়েল পেম্বারটন পপ-রক ও কান্ট্রি সংগীতের মিশ্রণে মহাকাশের অনিশ্চয়তাকে সুরে সুরে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সিনেমা বোদ্ধাদের মতে, ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ একটি সুপরিকল্পিত ফর্মুলা চলচ্চিত্র। জনপ্রিয় উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, তারকা অভিনেতা এবং জাঁকজমকপূর্ণ নির্মাণের কারণে এটি বক্স অফিসে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছে। তবে ‘ইন্টারস্টেলার’ বা এ ধরনের কালজয়ী চলচ্চিত্রের সাথে তুলনার ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদে দর্শকের মনে কতটা ছাপ ফেলতে পারবে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তা সত্ত্বেও, বর্তমানে বৈশ্বিক বিনোদন বাজারে সায়েন্স ফিকশন ঘরানার পুনর্জাগরণে এই চলচ্চিত্রের অবদান অনস্বীকার্য।


