আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে তিন দিনের একটি বিশেষ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার (৯ মে) থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধবিরতি আগামী সোমবার (১১ মে) পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের ইতিহাসে একে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম এই যুদ্ধবিরতির খবর নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তার ব্যক্তিগত অনুরোধে দুই দেশ এই সাময়িক অস্ত্রসংবরণে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেন, “আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তিন দিনের (৯, ১০ ও ১১ মে) যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে যাচ্ছে।” দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী এই লড়াই বন্ধের লক্ষ্যে এটি একটি ইতিবাচক সূচনার ইঙ্গিত বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণার পরপরই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) বিষয়টি নিশ্চিত করেন। জেলেনস্কি জানান, ওয়াশিংটনের শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই তিন দিনের যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে, ক্রেমলিনের পক্ষ থেকেও এই সমঝোতার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্টের সহকারী ইউরি উশাকভ জানান, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে সাম্প্রতিক এক টেলিফোন আলাপের পরিপ্রেক্ষিতে এই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
উশাকভ আরও উল্লেখ করেন যে, ফোনালাপে দুই নেতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিরুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতার কথা স্মরণ করেন। ৯ মে রাশিয়ার ঐতিহাসিক ‘বিজয় দিবস’ বা ‘ভিক্টরি ডে’ উদযাপিত হয়। এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখেই মূলত যুদ্ধবিরতির সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে রাশিয়ার পক্ষ থেকে বিজয় দিবস উপলক্ষে দুই দিনের একতরফা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হলেও, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত কিয়েভ ও মস্কো উভয়েই তিন দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সায় দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সামরিক বিরতি নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী শান্তি আলোচনার একটি ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামো ধ্বংস এবং মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এই তিন দিনের বিরতি বেসামরিক নাগরিকদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসন এই সমঝোতাকে তাদের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার জন্য পুতিন ও জেলেনস্কি উভয়কেই ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই সাময়িক বিরতি শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী সমাধান ও যুদ্ধের অবসানের পথ প্রশস্ত করবে। তবে তিন দিন পর যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কিয়েভ ও মস্কো উভয় পক্ষই এই সময়ে নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করবে নাকি আলোচনার টেবিলে স্থিতিশীল থাকবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের এই মে মাসে এসে ইউক্রেন সংকট এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেমন ফ্রন্টলাইনগুলোতে সংঘর্ষ তীব্রতর হচ্ছিল, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ বৈশ্বিক রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের প্রভাব এবং যুদ্ধরত দেশ দুটির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ পুনরায় স্পষ্ট করে তুলেছে। আগামী ৭২ ঘণ্টা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।


