জিয়াউর রহমানের ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ বিশিষ্টজনদের

জিয়াউর রহমানের ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ বিশিষ্টজনদের

জাতীয় ডেস্ক

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধ ‘একটি জাতির জন্ম’ পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা। তারা বলছেন, ১৯৭১ সালের পটভূমি ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রকৃত ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই লেখাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

১৯৭২ সালে দেশের প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষে তৎকালীন ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে স্বাধীনতা দিবসে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় এটি পুনর্মুদ্রণ করা হয়। সাবেক এই রাষ্ট্রপতির ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে এই নিবন্ধটির গুরুত্ব এবং জাতীয় পাঠ্যসূচিতে এর অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলা একাডেমির সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এই উদ্যোগের পক্ষে মত দিয়ে জানান, নিবন্ধটি একটি চমৎকার লিখিত রূপ এবং অনন্য ঐতিহাসিক দলিল। এটি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। একই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেছেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তিনি উল্লেখ করেন, সময়ের পরিক্রমায় মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ম্লান হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ১৯৭১ সালের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণের স্বার্থেই এই নিবন্ধটি পাঠ্যপুস্তকের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই প্রবন্ধটি পাঠ্যসূচিতে যুক্ত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পর্কে নানামুখী ও প্রামাণ্য তথ্য জানতে পারবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, নিবন্ধটি অত্যন্ত তথ্যবহুল এবং এতে কোনো বিভ্রান্তিকর উপাদান নেই। এটি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ সম্পর্কিত যেকোনো কোর্সে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইসরাফিল মন্তব্য করেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নতুন প্রজন্মের এই ইতিহাস জানা আবশ্যক, কারণ লেখাটিতে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকের পটভূমি অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে ফুটে উঠেছে।

নিবন্ধটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরুর পরপরই তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট এলাকা থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে তিনি বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করেছিলেন। ১৯৭২ সালে যখন নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়, তখন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান এবং মেজর জেনারেল পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একজন সম্মুখসারির বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার বিবরণ এই লেখায় স্থান পেয়েছে।

নিবন্ধে জিয়াউর রহমান ২৬শে মার্চকে ‘বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা দিন’ হিসেবে অভিহিত করে সেই সময়ের সশস্ত্র সংগ্রামের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুহূর্তগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। একইসঙ্গে তাঁর ছাত্রজীবন ও সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের ওপর পরিচালিত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নিপীড়নের চিত্রও তুলে ধরেছেন।

লেখায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার ১৯৪৮ সালের ভাষা সংক্রান্ত ঘোষণার সমালোচনা করে জিয়াউর রহমান উল্লেখ করেন, সেদিন থেকেই মূলত বাঙালিদের হৃদয়ে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন হয়েছিল এবং পাকিস্তানি জান্তার বৈষম্যমূলক নীতিই সশস্ত্র প্রতিরোধকে অনিবার্য করে তুলেছিল। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ, ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা পর্যায়ক্রমে ব্যাখ্যা করেছেন। বিশেষ করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ফলশ্রুতিতে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে যে সংহতি তৈরি হয়েছিল, তা তিনি উল্লেখ করেন।

নিবন্ধটিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকদের ষড়যন্ত্র এবং ১৯৭১ সালের মার্চে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের বিবরণ রয়েছে। জিয়াউর রহমান লিখেছেন, রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের একটি ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বা সবুজ সংকেত হিসেবে কাজ করেছিল। ২৫শে মার্চের নৃশংস গণহত্যার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

রণাঙ্গনের বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীর উত্তম’ খেতাবপ্রাপ্ত জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে প্রথমে একটি সেক্টরের নেতৃত্ব দেন এবং পরে তাঁর নামে গঠিত ‘জেড ফোর্স’ ব্রিগেডের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে তিনি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রবর্তন করেন। বিশিষ্টজনরা মনে করেন, একজন শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধকালীন সংগঠক ও রাষ্ট্রনায়কের এই রাজনৈতিক-সামরিক মূল্যায়ন তরুণ প্রজন্মের ঐতিহাসিক জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ