জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল পেলেন বাংলাদেশের নিহত ৬ শান্তিরক্ষী

জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল পেলেন বাংলাদেশের নিহত ৬ শান্তিরক্ষী

জাতীয় ডেস্ক

সুদানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে নিহত বাংলাদেশের ছয়জন শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল’ প্রদান করা হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ স্মারক অনুষ্ঠানে এই মর্যাদাপূর্ণ পদক তুলে দেওয়া হয়।

শনিবার ঢাকায় প্রাপ্ত এক সরকারি বার্তায় জানানো হয়, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরীর কাছে এই সম্মাননা পদক হস্তান্তর করেন। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া সুদানের চলমান রাজনৈতিক সংকট ও সশস্ত্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, সেখানে নিয়োজিত বিশ্ব শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

মরণোত্তর পদকপ্রাপ্ত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা হলেন—কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা, প্রাইভেট মো. জাহাঙ্গীর আলম, প্রাইভেট মো. সবুজ মিয়া, প্রাইভেট মো. মোমিনুল ইসলাম, প্রাইভেট শামীম রেজা এবং প্রাইভেট সান্তো মন্ডল।

২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর সুদানের কাদুগলির আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী নিরাপত্তা বাহিনীতে (ইউএনআইএসএফএ) দায়িত্ব পালনকালে একটি আকস্মিক ড্রোন হামলায় তারা নিহত হন। এই হামলায় বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষা মিশনের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিষয়টি পুনরায় সামনে আসে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হলেও, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্যদের মধ্যে যারা দায়িত্ব পালনকালে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেন, তাদের স্মরণে প্রতিবছর ড্যাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল প্রদান করা হয়। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের দ্বিতীয় মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড্যাগ হ্যামারশোল্ডের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই মেডেলের নামকরণ করা হয়, যিনি নিজে ১৯৬১ সালে কঙ্গোতে শান্তিরক্ষা মিশন চলাকালে এক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন।

স্মারক অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতিসংঘ মহাসচিব কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত সকল শান্তিরক্ষীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং তাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে বর্তমানে কর্মরত ৫০ হাজারেরও বেশি শান্তিরক্ষীর অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, চরম প্রতিকূলতা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই শান্তিরক্ষীরা বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা দিচ্ছেন এবং সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছেন।

চলতি বছর দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো জাতিসংঘের ৩৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মোট ৬৮ জন সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক শান্তিরক্ষীকে এই মেডেল প্রদান করা হয়েছে। পদক প্রদান অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী জাতিসংঘ সদর দপ্তরের শোকবইয়ে স্বাক্ষর করে নিহত বাংলাদেশি বীর শান্তিরক্ষীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

বাংলাদেশ ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সৈন্য ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। তবে এই গৌরব অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশকে এ পর্যন্ত বহু শান্তিরক্ষীর জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশটির অবিচল অঙ্গীকারকে পুনর্ব্যক্ত করে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ