মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা: ইরান-ইসরায়েল পাল্টা-পাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আকাশসীমা বন্ধ

মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা: ইরান-ইসরায়েল পাল্টা-পাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আকাশসীমা বন্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এক নতুন এবং বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে শান্ত থাকা ইরান পুনরায় সরাসরি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ও তীব্র সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় তেহরান তাদের পূর্ববর্তী অবস্থান পরিবর্তন করেছে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। স্থানীয় সময় রবিবার দিবাগত রাতে ইসরায়েলের একটি কৌশলগত বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এই হামলার পর সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইরানের এই আকস্মিক ও সরাসরি হামলার জবাবে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ইরানের রাজধানী তেহরান, ঐতিহাসিক নগরী তাবরিজ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু ও সামরিক স্থাপনা সমৃদ্ধ ইসফাহান শহর লক্ষ্য করে ‘আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য’ অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা হামলা চালায়। ইসরায়েলের এই বিমান অভিযানের পরপরই আঞ্চলিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইয়েমেন থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

ইয়েমেন থেকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে মধ্য ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ অর্থনৈতিক ও আবাসিক এলাকায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়। জানমালের নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সমস্ত আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যগামী এবং ওই অঞ্চলের ওপর দিয়ে পরিচালিত অসংখ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট সূচি বিপর্যয় ও রুট পরিবর্তনে বাধ্য হয়, যা বৈশ্বিক বিমান চলাচলেও স্থবিরতা সৃষ্টি করে।

এই সংকটের শুরুতেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে উত্তেজনা প্রশমনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রাথমিক হামলার পর ইসরায়েলকে নতুন করে কোনো পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছিলেন। তেহরানের সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা বহুদূর এগিয়েছে উল্লেখ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ওয়াশিংটন আশা করেছিল ইসরায়েল এই পরিস্থিতিতে সংযম প্রদর্শন করবে। তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে জানান, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী যদি পুনরায় আঘাত হানার পথ বেছে নেন, তবে এই অঞ্চলে গত ৪৭ বছর কিংবা বিগত ৩ হাজার বছরের ঐতিহাসিক সংঘাতের ধারাবাহিকতা চলতেই থাকবে, যার কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না।

তবে মার্কিন প্রশাসনের এই সর্বোচ্চ কূটনৈতিক অনুরোধ এবং যুদ্ধ এড়ানোর আহ্বান উপেক্ষা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তেল আবিব তাদের সার্বভৌমত্ব ও নাগরিকদের সুরক্ষার স্বার্থে পাল্টা হামলা চালানোকে অপরিহার্য বলে মনে করেছে। ইসরায়েলের এই কঠোর সামরিক অবস্থানের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইতার এক বিবৃতিতে জানান, ইরান সরাসরি ইসরায়েলের ভূখণ্ডে ১১টি অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রতিটিই শত শত বেসামরিক মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার সক্ষমতা রাখত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যেকোনো আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন স্বাধীন রাষ্ট্র নিজের ওপর এমন সুনির্দিষ্ট আক্রমণ নীরবে মেনে নেবে না এবং ইসরায়েলও তা করেনি।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পাল্টা-পাল্টি হামলার ঘটনাটি কেবল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। লেবানন ও ইয়েমেনের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে এই সংঘাত একটি বহুমাত্রিক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। বর্তমানে এই অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির এবং যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ