ক্রীড়া ডেস্ক
উত্তর আমেরিকার তিন দেশে ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে এক বড় আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং এর বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। উয়েফার সাবেক সভাপতি ও ফ্রান্সের ফুটবল কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনি প্যারিসের একটি আদালতে ইনফান্তিনোসহ ফিফার একাধিক সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন। ২০১৫ সালের একটি বিতর্কিত দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর এই পদক্ষেপ নিলেন ৭০ বছর বয়সী প্লাতিনি।
প্যারিসে দায়ের করা ফৌজদারি অভিযোগে প্লাতিনি দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিদ্বেষমূলক মামলা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছিল। এই মামলায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ছাড়াও সংস্থাটির সাবেক আইনি পরিচালক মার্কো ভিলিজার এবং অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান দোমেনিকো স্কালাকে বিবাদী করা হয়েছে। পাশাপাশি ফিফার বিরুদ্ধে দায়ের করা পৃথক দেওয়ানি মামলায় প্লাতিনি অভিযোগ করেন, এক দশকেরও বেশি সময় আগে বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থার প্রধান পদে তাঁর নির্বাচিত হওয়া আটকাতে ভেতর থেকে নানা কূটকৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণে ফিফার কাছ থেকে পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন ১৯৮৪ সালের ইউরোজয়ী ফরাসি এই অধিনায়ক।
এই আইনি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটেছিল ২০১৫ সালের শেষভাগে। তৎকালীন ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার কর্তৃক ২০১১ সালে প্লাতিনিকে ২০ লাখ সুইস ফ্রাঁ (তৎকালীন মূল্যে প্রায় ২৫ লাখ ১০ হাজার ডলার) প্রদানের বিষয়টি জনসমক্ষে আসার পর ফুটবলাঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ফিফার নৈতিকতা কমিটি প্লাতিনিকে ফুটবলীয় কর্মকাণ্ড থেকে আট বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে তৎকালীন উয়েফা প্রধান প্লাতিনির ফিফা সভাপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্লাতিনির অধীনে উয়েফার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০১৬ সালের শুরুতে ফিফার নতুন সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ সুইজারল্যান্ডের একটি ফেডারেল ফৌজদারি আপিল আদালত প্লাতিনি এবং সেপ ব্ল্যাটারকে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ থেকে চূড়ান্তভাবে খালাস প্রদান করেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে এই খালাসের রায় পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। এই বিচারিক বিজয়ের ওপর ভিত্তি করেই ফ্রান্সে নতুন করে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন প্লাতিনি। তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে তাঁকে ফুটবল নেতৃত্ব থেকে ছিটকে দেওয়া হয়েছিল। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় নির্দোষ প্রমাণিত হলেও, ফুটবলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে ফিরে আসার জন্য নিজের বর্তমান বয়সকে অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্লাতিনি।
নতুন করে দায়ের করা এই মামলায় ফরাসি তদন্তকারীদের কাছে ফিফা কর্মকর্তাদের সে সময়ের ভূমিকা ও আচরণ গভীরভাবে খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, ২০১৫ সালের মূল ফৌজদারি তদন্ত চলাকালীন সুইজারল্যান্ডের প্রসিকিউটরদের সঙ্গে ফিফা কর্তৃপক্ষের কোনো অনৈতিক বা নিয়মবহির্ভূত আঁতাত ছিল কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো জমকালো বৈশ্বিক আসর শুরুর প্রাক্কালে ফুটবল প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের এই আইনি সংঘাত ফিফার ভাবমূর্তিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যদিও বিশ্ব ফুটবলের এই নিয়ামক সংস্থা অতীতেও ২০১৫ সালের ঘটনার তদন্ত বা তা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের কোনো অনিয়ম বা অপকর্মের কথা বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। চলমান এই আইনি পদক্ষেপ ও অভিযোগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে ফিফা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


