নিখোঁজের একদিন পর শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার: লালমনিরহাটে বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে পুলিশের সংঘর্ষ, এসপিসহ আহত ৩০

নিখোঁজের একদিন পর শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার: লালমনিরহাটে বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে পুলিশের সংঘর্ষ, এসপিসহ আহত ৩০

সারাদেশ ডেস্ক

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে নিখোঁজের একদিন পর নন্দিনী রায় (৭) নামে এক শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার (১৬ জুন) এলাকায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ক্ষুব্ধ জনতার সাথে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি), পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে হয়।

নিহত নন্দিনী রায় ফলিমারী গ্রামের বাসিন্দা নলিনী কান্ত রায়ের মেয়ে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (১৫ জুন) দুপুর থেকে শিশুটিকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করার পর সন্ধান না পেয়ে রাতে স্বজনরা আদিতমারী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, রাতে থানায় যাওয়ার পরও পুলিশ তাদের জিডি গ্রহণ করেনি এবং কালক্ষেপণ করে।

মঙ্গলবার সকালে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে নতুন খোঁড়া মাটি ও রক্তাভ দাগ দেখে সন্দিহান হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা স্বউদ্যোগে ওই স্থানে মাটি খুঁড়ে একটি প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন। খবর পেয়ে আদিতমারী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

এদিকে নিখোঁজের রাতে জিডি গ্রহণ না করা এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার দায়ে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হককে তাৎক্ষণিকভাবে থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে লালমনিরহাট পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ এবং শিশু হত্যার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে এক অভিযুক্তের বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনতাকে শান্ত করতে জেলা পুলিশ সুপার অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে উত্তেজিত জনতা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। একপর্যায়ে তা দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষ চলাকালে জেলা পুলিশ সুপার, কর্তব্যরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য এবং দায়িত্ব পালনরত সংবাদকর্মীসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। এ সময় সরকারি ও বেসরকারি বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে হয়। বর্তমানে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি থমথমে কিন্তু পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র (২৩) ও রঞ্জিত কুমার রায় (৩০) নামে দুই যুবককে আটক করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে জানান, মরদেহের প্রাথমিক অবস্থা এবং পারিপার্শ্বিক আলামত পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি আরও জানান, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সাথে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে পৃথক মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।

শীর্ষ সংবাদ সারাদেশ