অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই (জুলাই-আপ্রিল) বিদেশে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের পাঠানো ব্যয়ের পরিমাণ ৭৩ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, অর্থবছরের বাকি দুই মাসের (মে ও জুন) তথ্য যুক্ত হলে এই ব্যয়ের পরিমাণ ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে। উচ্চ শিক্ষার পেছনে বিদেশে চলে যাওয়া এই বিপুল অর্থের পরিমাণ দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক বরাদ্দকৃত মোট বাজেটের চেয়েও বেশি।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। চলতি অর্থবছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে ডলারে রূপান্তর করলে এই বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৮ কোটি ডলার, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে শিক্ষার্থীদের বিদেশ পাঠানো ব্যয়ের চেয়ে কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত কয়েক অর্থবছর ধরে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় অর্থ পাঠানোর পরিমাণ দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা বাবদ বিদেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণ ছিল ২১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। পরবর্তী অর্থবছরগুলোয় এটি ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ কোটি ৩১ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ ৪৫ লাখ ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫২ কোটি ৮ লাখ ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৩ কোটি ৩২ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলারে পৌঁছায়। সর্বশেষ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই তা ৭৩ কোটি ৬ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের তুলনায় (অনূর্ধ্ব ৫৩ কোটি ডলার) চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এই ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত মান ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং উচ্চ শিক্ষিতদের জন্য অভ্যন্তরীণ বাজারে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবই শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান বিদেশমুখী হওয়ার প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংগুলোয় দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান অবনমনশীল। ‘টাইмс হায়ার এডুকেশন’ এবং ‘কিউএস’ এর সর্বশেষ বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে শীর্ষ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থান হয়নি। কিউএস র্যাংকিংয়ে দেশের শীর্ষে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৫৮৫তম।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ। এছাড়া উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের ৫৮ দশমিক ৭৩ শতাংশই বাধ্য হয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত রয়েছেন। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের এই তীব্র সংকটের কারণে তরুণরা দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী মনে করেন, নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার অভাব এবং দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা না বাড়ানোর ফলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। গুণগত শিক্ষার নামে এমন কিছু নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে যা উচ্চ শিক্ষার সুযোগকে সংকুচিত করছে, যার ফলে তরুণরা বিদেশমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। এটি রোধ করতে না পারলে দেশ দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক ও মেধাপাচারের (ব্রেন ড্রেন) সম্মুখীন হবে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্যও শিক্ষার্থীদের এই ক্রমবর্ধমান বিদেশগমনের চিত্র নিশ্চিত করে। ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ২৪ হাজার ১১২ জন শিক্ষার্থী বিদেশে গেলেও ১০ বছরের ব্যবধানে ২০২৩ সালে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৫২ হাজার ৭৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে।
বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের শীর্ষ গন্তব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও মালয়েশিয়া। ২০২৫ সালের ‘ওপেন ডোরস রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ২০ instant ১৫৬ জনে পৌঁছেছে, যা গত ছয় বছরের তুলনায় ১২৮ শতাংশ বেশি। জাপানে ২০১৭ সালে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ২ হাজার ৭৪৮ জন থাকলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৭ হাজার ৫৯৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, এডুকেশন মালয়েশিয়া গ্লোবাল সার্ভিসের তথ্যমতে, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় ১১ হাজার ৪০১ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন, যেখানে বিগত এক বছরে শিক্ষার্থী ভর্তি বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন জানান, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ এবং মানসম্মত কর্মজীবনের নিশ্চয়তা না থাকায় শিক্ষার্থীরা দেশ ছাড়ছেন। মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে হলে দেশে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি আন্তর্জাতিক মানের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া আবশ্যক।
একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরীর বক্তব্যেও। তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষার মানের চেয়েও দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও মানসম্মত জীবনযাত্রার অভাব তরুণদের দেশ ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করছে। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষাকে কেবল বিদেশ গমনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং সেখানে গিয়ে শিক্ষার চেয়ে জীবিকা নির্বাহ ও স্থায়ীভাবে বসবাসের দিকেই বেশি মনোযোগী হচ্ছেন।


