জাতীয় ডেস্ক
চীন ও মালয়েশিয়া সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দ্বিপাক্ষিক এই সফরের মাধ্যমে উভয় দেশের সাথে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে চীনের বেইজিং থেকে প্রতিনিধিদলসহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। বিমানবন্দরে সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন বিমানবন্দরে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিস্তারিত অগ্রগতি ও অর্জনসমূহ তুলে ধরেন।
মুখপাত্র জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই সংক্ষিপ্ত সফরটি তিনটি প্রধান পর্বে বিভক্ত ছিল। সফরের প্রথম অংশে তিনি মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেন। সেখানে মালয়েশিয়ার রাজা এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে নিবিড় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সফরের দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রী চীনের ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিশেষ অধিবেশনে যোগ দেন। অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি ফোরামের প্রেসিডেন্ট, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সাথে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন। সফরের চূড়ান্ত পর্বে চীনের প্রিমিয়ারের আমন্ত্রণে বেইজিং সফরে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং, প্রিমিয়ার এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক ও একাত্ত বৈঠক সম্পন্ন করেন।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ বিশ্লেষণ করে মুখপাত্র জানান, উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্যের প্রসার, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনযোগাযোগ (পিপল-টু-পিপল কানেক্টিভিটি) জোরদারের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের মতো খাতগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে কথা হয়েছে। এই কূটনৈতিক যোগাযোগের ফলে বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় চীন ও মালয়েশিয়ার অংশগ্রহণ আরও সুনির্দিষ্ট ও বেগবান হবে।
চীনের সাথে সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের বিষয়ে মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, বেইজিংয়ে রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সাথে দ্বিপাক্ষিক ও একান্ত বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার ব্যাপারে চীনের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। চীন ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্কের পটভূমি স্মরণ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুই দেশের একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সম্পর্ককে একটি ‘দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ (লং-টার্ম স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য হবে যৌথ কৌশল, বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
সংবাদ সম্মেলনে চীনের আঞ্চলিক করিডোর প্রস্তাবনা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশ এই প্রস্তাবকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করছে। প্রস্তাবটি বর্তমানে পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (ফিজিবিলিটি অ্যানালাইসিস) প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো একক দেশের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও এশীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্র প্রসারিত করার একটি মহাপরিকল্পনা হিসেবে এটিকে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সরকারের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নীতিমালা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর শ্রমবাজার পুনর্নির্ধারণ করা হলে বাংলাদেশকে ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ বা অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হবে। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্বার্থের জায়গাটি নিয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অত্যন্ত সহমর্মিতার সাথে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে।
বিমানবন্দরে কোনো প্রকার রাজনৈতিক জমায়েত বা সমাবেশ না হওয়া প্রসঙ্গে মুখপাত্র জানান, জনভোগান্তি এড়াতে প্রধানমন্ত্রীর পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো দলীয় নেতাকর্মী বিমানবন্দরে উপস্থিত হননি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ের সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবদুল্লাহ এম ছালেহ, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এবং শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন উপস্থিত ছিলেন। সরকারের নীতি নির্ধারকদের মতে, এই সফরের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


