জাতীয় ডেস্ক
কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর আরও ১০৯ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। মঙ্গলবার রাত ১টা ২৫ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এর মাধ্যমে বিগত চার দিনে কম্বোডিয়া থেকে মোট ৩৬২ জন এবং সদ্য সমাপ্ত জুন মাসেই সর্বমোট ৫৮৩ জন প্রতারণার শিকার বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগে ভুক্তভোগীদের জরুরি সহায়তা, মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং এবং নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
কম্বোডিয়ায় মানব পাচার ও সাইবার দাসত্বের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের বিবরণ থেকে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। অধিকাংশ ভুক্তভোগীকেই দেশীয় রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্রের মাধ্যমে কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ বা কাস্টমার সার্ভিসের মতো উচ্চ বেতনের আকর্ষণীয় চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। ভুয়া ওয়েবসাইট, ই-মেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো অনলাইন মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ফাঁদ পেতে যুবকদের আকৃষ্ট করা হয়। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদেশ গেলেও, কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের মাত্র এক মাসের পর্যটন (ভিজিট) ভিসা দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে নামার পরপরই স্থানীয় ও বাংলাদেশি দালালরা তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড বা অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রে বিক্রি করে দেয়।
স্ক্যাম কম্পাউন্ডগুলোর ভেতরে ভুক্তভোগীদের সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ রেখে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে অনলাইন আর্থিক প্রতারণা ও সাইবার অপরাধ করতে বাধ্য করা হতো। দৈনিক নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বা ‘টার্গেট’ পূরণ করতে না পারলে ভুক্তভোগীদের ওপর নেমে আসত অমানুষিক নির্যাতন। কম্পাউন্ডের অভ্যন্তরে বিশেষায়িত ‘টর্চার সেল’ বা নির্যাতন কক্ষে নিয়ে তাদের লাঠি দিয়ে মারধর, শারীরিক নিগ্রহ এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হতো। সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্দিষ্ট কিছু স্ক্যাম সেন্টারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করলে চক্রের মূল হোতারা পালিয়ে যায়, যার ফলে এই বাংলাদেশিরা মুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।
বিএমইটির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত দেড় বছরে অন্তত ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি নাগরিক কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বৈধভাবে কম্বোডিয়ায় গমন করেছেন। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য ও ফেরত আসা ব্যক্তিদের দাবি, সেখানে এখনো কয়েক হাজার বাংলাদেশি চাকরি না পেয়ে অথবা তীব্র প্রতারণার শিকার হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই অপরাধের নেটওয়ার্ক কেবল কম্বোডিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তাদেরও ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ড সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মিয়ানমারের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্গম অঞ্চলে নিয়ে সাইবার দাসত্বে বাধ্য করা হয়েছিল।
এই ভয়াবহ মানব পাচার ও প্রতারণার ঘটনায় ইতিমধ্যেই ফেরত আসা বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী দেশের বিভিন্ন থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা দায়ের করেছেন। সংশ্লিষ্ট অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু উদ্ধার বা প্রত্যাবাসনই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে জড়িত দেশীয় রিক্রুটিং এজেন্সি, ভুয়া লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান এবং দালালদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সাথে বিএমইটির ছাড়পত্র থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বিপুল সংখ্যক কর্মী পর্যটন ভিসায় পাচার হলেন, তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে, বিশেষ করে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস এবং ভিয়েতনামে আইটি বা কম্পিউটার সংক্রান্ত চাকরিতে গমনের ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো ধরনের বৈদেশিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের সত্যতা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, ভিসার ধরন এবং কর্মপরিবেশ সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে আর কোনো নাগরিককে এমন আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের শিকার হতে না হয়।


