আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের ছয় দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। জর্ডানের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল দেশটির লা গুয়াইরা রাজ্য থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এই শিশুকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। দুর্যোগের দীর্ঘ সময় পর এই উদ্ধার অভিযানকে দেশটিতে চলমান অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতায় একটি বড় আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উদ্ধারকৃত শিশুটির নাম ক্লিবার মোরান বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। জর্ডানের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, শিশুটিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করার পরপরই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে রাজধানী কারাকাসের একটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে এবং শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট জর্জ রদ্রিগেজ এই ঘটনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, ক্লিবারের উদ্ধার প্রমাণ করে যে দুর্যোগের এত দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাধারণত যেকোনো বড় ভূমিকম্পের পর প্রাথমিক ৭২ ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা স্বর্ণালী সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারের হার সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়সীমা পার হওয়ার পর সাধারণত জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসে। তবে ষষ্ঠ দিনে এই শিশুটির বেঁচে ফেরা আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারীদের নতুন উদ্দীপনা জুগিয়েছে। বর্তমানে লা গুয়াইরাসহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত কুকুরের সহায়তায় ব্যাপক অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে।
ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৪৩ জনে। এ ছাড়া ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও কয়েক হাজার নাগরিক। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম লা গুয়াইরা রাজ্যে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। সেখানে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও স্বপ্রণোদিত হয়ে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। অন্যদিকে, নিখোঁজ স্বজনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে অনেকেই এখন ধ্বংসস্তূপের পাশে মরদেহের জন্য অপেক্ষা করছেন এবং উদ্ধার হওয়া স্বজনদের দাফন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ এবং এর বিভিন্ন সহযোগী সংস্থাগুলো জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। নাসার স্যাটেলাইট তথ্যের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভূমিকম্পে দেশটিতে অন্তত ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, লা গুয়াইরাসহ উপদ্রুত এলাকাগুলোতে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে, মৌলিক নাগরিক সেবাগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে এবং যোগাযোগ অবকাঠামো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সংস্থাটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ হাজার মানুষের জরুরি সুরক্ষা, মৌলিক ত্রাণসামগ্রী ও অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার জন্য প্রাথমিকভাবে ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তহবিল প্রয়োজন।
একই সাথে দেশটির স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমেয়ার জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে ভেনেজুয়েলার সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখন চরম চাপের মুখে রয়েছে। দুর্যোগ কবলিত এলাকাগুলোতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটার উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুর্যোগপীড়িত এলাকাগুলোতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও জরুরি চিকিৎসা ক্যাম্প স্থাপন করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ ভেনেজুয়েলার এই মানবিক সংকট উত্তরণে জরুরি ত্রাণ সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছে।


