হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে যৌথ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ইরান ও ওমানের, যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র আপত্তি

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে যৌথ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ইরান ও ওমানের, যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র আপত্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর যৌথভাবে একটি ‘সেবা মাশুল’ বা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে ইরান ও ওমান। যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র আপত্তি ও সামরিক হুশিয়ারি সত্ত্বেও দেশ দুটি এই পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির শর্তানুযায়ী, ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালীন হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো ধরনের মাশুল ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারবে। তবে ওই চুক্তির অংশ হিসেবেই দীর্ঘমেয়াদে একটি যৌথ পরিকল্পনা তৈরি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে ইরান ও ওমানের ওপর। যুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক বাণিজ্যিক মডেলের অংশ হিসেবে এই টোল বা শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা মূলত শত শত বছর ধরে চলে আসা মুক্ত নৌ-চলাচলের আন্তর্জাতিক রীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

প্রস্তাবিত এই শুল্কের রূপরেখা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওমান চাইছে এই শুল্কের বিষয়টি যেন জাহাজের মালিকপক্ষের জন্য ‘ঐচ্ছিক’ রাখা হয়, কিন্তু ইরান এটিকে সবার জন্য ‘বাধ্যতামূলক’ করার ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়েছে। মূলত হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ-চলাচল বজায় রাখার পেছনে যে বিপুল পরিচালন ব্যয় হয়, তা মেটাতেই এই অর্থ ব্যবহার করতে চায় ওমানের রাজধানী মাস্কাট। এই প্রক্রিয়াটি মালাক্কা বা সিঙ্গাপুর প্রণালীর বর্তমান শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ওমানের সঙ্গে যদি কোনো যৌথ চুক্তি সম্পন্ন না-ও হয়, তবে তেহরান একতরফাভাবেই এই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। মূলত ইরানের এমন একতরফা ও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত এড়াতেই ওমান একটি মধ্যপন্থা বা বিকল্প কূটনৈতিক উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে।

এদিকে ইরান ও ওমানের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রণালিটি একটি আন্তর্জাতিক জলসীমা এবং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, কোনো একক দেশ বা জোট এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না। ওমান যদি ইরানের সাথে মিলে হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের শুল্ক আরোপের চেষ্টা করে, তবে দেশটিতে সামরিক হামলা চালানো হতে পারে বলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্বের এমন কঠোর অবস্থানের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে মার্কিন কূটনীতিকদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরবর্তীতে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারির সাথে এক গোপন বৈঠকে ওমানি কূটনীতিকরা আশ্বস্ত করেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক আরোপের কোনো একতরফা পরিকল্পনা তাদের নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলসীমায় যেকোনো ধরনের শুল্ক আরোপ বা রাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইরানের একতরফা শুল্ক আরোপের হুমকি এবং মার্কিন সামরিক হুশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ওমান ও ইরানের যৌথ সিদ্ধান্তের ওপর এখন এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ ও ভূ-রাজনীতি অনেকাংশে নির্ভর করছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ