অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা ইতিবাচক দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকটের উদ্বেগ অনেকটাই কেটে গেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের প্রধান দুটি মানদণ্ড—ব্রেন্ট ক্রুড এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—উভয় সূচকেই জ্বালানি তেলের দাম কমে গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতির বিষয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। লণ্ডনের আইসিই ফিউচার্স এক্সচেঞ্জে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ ডলার ৩৮ সেন্ট বা ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ৭১ ডলার ৫৭ সেন্টে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, নিউইয়র্ক মার্চেন্টাইল এক্সচেঞ্জে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯২ সেন্ট বা ১ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে ৬৮ ডলার ৫৮ সেন্টে নেমে এসেছে। উভয় সূচকের এই দরপতন গত মার্চের পর দৈনিক লেনদেনে সর্বনিম্ন মূল্যের নতুন রেকর্ড।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ইরান প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসা কিছু ইতিবাচক বক্তব্য এই বাজার পরিস্থিতি তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা যথাক্রমে ‘খুব ভালো’ এবং ‘অত্যন্ত ভালো’ভাবে এগোচ্ছে। বিশেষ করে কাতারের রাজধানী দোহায় দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো ইতিবাচক হয়েছে বলে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্র ও ইরানের একজন সরকারি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দোহায় কারিগরি পর্যায়ের এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনো কিছু নীতিগত পার্থক্য রয়েছে, এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও মাঠপর্যায়ে উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা সত্ত্বেও এই আলোচনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে ইতিবাচক বার্তা গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হলে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে যে, কৌশলগত এই জলপথ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ইতিমধ্যেই সংঘাতপূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে এসেছে।
এদিকে, বৈশ্বিক এই দরপতনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মজুত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩৮ লাখ ব্যারেল কমে ৪০ কোটি ৮৪ লাখ ব্যারেলে নেমেছে, যা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের পর দেশটির সর্বনিম্ন অভ্যন্তরীণ মজুত। মূলত ৪ জুলাইয়ের জাতীয় ছুটিকে সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলোর উৎপাদন চাহিদা বাড়ায় এই মজুত কমেছে। তবে বাজার বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস ছিল মজুত ৪৫ লাখ ব্যারেল কমতে পারে, সেই তুলনায় প্রকৃত হ্রাসের পরিমাণ কিছুটা কম।
ভূ-রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদে তেলের মূল্যের পূর্বাভাস সংশোধন করতে শুরু করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা শুরুর পর এই প্রথম বিশ্লেষকেরা তেলের ভবিষ্যৎ মূল্যসূচক কমিয়েছেন। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪৫ ডলার হ্রাস পেয়েছে, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক দরপতন। একই সময়ে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে প্রায় ৩১ ডলার, যা ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাবের পর থেকে একক প্রান্তিকে সর্বোচ্চ মূল্যহ্রাসের ঘটনা। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।


