আইন ও মানবাধিকার ডেস্ক
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ময়নাতদন্তের জন্য আনা নারীর মরদেহ সংরক্ষক বা ডোম হিসেবে নারীদের নিয়োগ দেওয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রবিবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন।
আদালত আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এই রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। রিট আবেদনটি দায়ের করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মনির উদ্দিন।
আইনজীবী মো. মনির উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতায় একজন নারীর মরদেহ ময়নাতদন্তের সময় পুরুষ ডোম বা পুরুষ কর্মীর উপস্থিতি পরিবারের জন্য যেমন অস্বস্তিকর, তেমনি এটি মৃত নারীর গোপনীয়তা ও মর্যাদার পরিপন্থী। অতীতে ময়নাতদন্তের সময় বা মর্গে মরদেহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নারীদের অসম্মানজনক পরিস্থিতির শিকার হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাই মৃত নারীর মর্যাদা রক্ষা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নারী ডোম নিয়োগ এখন সময়ের দাবি।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ময়নাতদন্ত একটি আইনি প্রক্রিয়া হলেও এর সঙ্গে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী সমাজে নারীর মৃতদেহ পর্দার অন্তরালে রাখার বিধান রয়েছে। এ অবস্থায় পুরুষ ডোম কর্তৃক নারীর শরীরের স্পর্শ বা উপস্থিতি অনেকের কাছেই অগ্রহণযোগ্য ও বেদনাদায়ক। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনা বা আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যরা যখন জানতে পারেন যে তাদের প্রিয়জন পুরুষ কর্মীর তত্ত্বাবধানে ময়নাতদন্তের জন্য রাখা হয়েছে, তখন তারা চরম মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন।
আবেদনকারী আরও যুক্তিতে দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগে কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি স্তরে নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। ময়নাতদন্তের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে নারী ডোম নিয়োগ করা হলে মৃত নারীর গোপনীয়তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যরা স্বস্তি পাবেন। এছাড়া অতীতে পুরুষ ডোমের দ্বারা মৃত নারীর অমর্যাদা বা বিকৃত যৌনাচারের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধে এবং নারীর ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নারী ডোম নিয়োগ করা অপরিহার্য।
মানবাধিকার সনদের উল্লেখ করে আবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুর পরও একজন মানুষের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র এই অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য। ময়নাতদন্তের মতো আইনি প্রক্রিয়ায় নারী ডোম নিয়োগের মাধ্যমে একদিকে যেমন ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানানো সম্ভব, তেমনি এটি বৈষম্য নিরসন ও আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে এই রিট আবেদনের বিষয়টি নিয়ে আবেদনকারী আইনজীবী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন জানিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পাওয়ায় তিনি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, হাইকোর্টের এই রুল নারী মর্যাদা ও মৃতদেহের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে কি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর সবার।


