জাতীয় ডেস্ক
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যাকবলিত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং সার্বিক সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী জোরদারে সরকারের নতুন দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের স্থায়ী আবাসন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে গৃহীত নানা পদক্ষেপের অংশ হিসেবে পুনর্বাসন, আর্থিক অনুদান এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী হস্তান্তরের এই কর্মসূচি আয়োজিত হয়। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক গতিশীলতা আনয়ন এবং জ্বালানি ও স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারে বর্তমান প্রশাসনের গৃহীত নানামুখী নীতির বিশদ বিবরণ প্রদান করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহীন পরিবারের মাঝে নবনির্মিত গৃহ হস্তান্তর, বিশেষ আর্থিক অনুদান ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারের জাতীয় ও আঞ্চলিক উন্নয়ন ভাবনার কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়, জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা এবং দুর্যোগ পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত জীবনকে পুনরায় স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনাই যেকোনো দায়বদ্ধ সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল পূর্বশর্ত হিসেবে দেশের সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয় যে, সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বজায় থাকলে কাঙ্ক্ষিত জাতীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে। তাই নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা-বান্ধব ও সহায়ক সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। শান্ত ও স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখা না গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন নীতিনির্ধারকরা।
অনুষ্ঠানে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের পরিধি প্রসারের ঘোষণা দিয়ে জানানো হয় যে, পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করার পর আগামী ১৬ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহুল প্রতীক্ষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে। বর্তমান প্রাক্কলিত অর্থ বছরের মধ্যেই দেশের মোট ৪১ লাখ নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা হবে। এই উদ্যোগের ফলে বাজারমূল্যের প্রভাব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রাপ্তি সহজতর হবে, যা মূলত দেশের সার্বিক দারিদ্র্য নিরসন এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে এক তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার পরিধি তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা জানিয়ে উল্লেখ করা হয় যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবকাঠামোগত ও সেবামূলক সামর্থ্য বৃদ্ধি করে সেগুলোকে ১০১ শয্যাবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে উন্নীত করা হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মৌলিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ সহজ করা এবং প্রধান জেলা শহরগুলোর চিকিৎসাকেন্দ্রের ওপর থেকে অতিরিক্ত রোগীর চাপ কমাতেই মূলত এই দীর্ঘমেয়াদী মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ নিজ নিজ উপজেলাতেই তুলনামূলক উন্নত চিকিৎসার সুযোগ লাভ করতে সক্ষম হবে।
অপরদিকে, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অতীত অব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে বিশদ বক্তব্য প্রদান করা হয়। বিগত সময়ে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত ও সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এই খাতের অবকাঠামো যেভাবে পরিচালিত হয়েছিল, তা জাতীয় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে মন্তব্য করা হয়। এই খাতের বর্তমান সংকট রাতারাতি সমাধানযোগ্য নয় উল্লেখ করে টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে সরকার আগামী ১০ বছরের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বা রূপরেখা প্রণয়ন করছে, যা শিগগিরই দেশের জাতীয় সংসদে পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপন করা হবে।
একই সঙ্গে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অহেতুক বিভ্রান্তি না ছড়ানোর জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশের উন্নয়ন বজায় রেখে সংকট উত্তরণে কোনো গঠনমূলক মতামত বা বিকল্প প্রস্তাবনা থাকলে তা রাজপথের রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সংসদের টেবিলে পেশ করার তাগিদ দেওয়া হয়। দেশকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে রাখার পথ পরিহার করে সার্বিক আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতি অব্যাহত রাখার তাগিদ দিয়ে বক্তব্য সমাপ্ত হয়।


