বাংলাদেশ থেকে ৬৮৩০ কোটি ডলার পাচারের চিত্র, জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে প্রকাশ

বাংলাদেশ থেকে ৬৮৩০ কোটি ডলার পাচারের চিত্র, জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে প্রকাশ

 

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

মার্কিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে (২০১৩-২০২২) বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮.৩০ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২.৭৫ টাকা) অনুযায়ী, এ অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬.৮৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৮৩ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান। মূলত আমদানি ও রপ্তানিতে মিথ্যা ঘোষণা বা পণ্যের মূল্য কারসাজির মাধ্যমে এই অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অর্থ পাচারের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাচার হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে চলে যায়। এ ধরনের প্রবণতা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে দুর্বল করে, কর আদায় কমায় এবং জনসেবা ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা সীমিত করে।

দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশ থেকে পাচার হওয়া মোট অর্থের প্রায় ৭৫ শতাংশই বাণিজ্য চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, আমদানি ও রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে এই অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে করা গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন সংশোধনের পর চিহ্নিত ৯৫টি ঘটনা সবই বাণিজ্য চ্যানেলের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে, যার মোট পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বাণিজ্য চ্যানেল ব্যবহার করে বড় অঙ্কের অর্থ দ্রুত এবং সহজে স্থানান্তর করা সম্ভব। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শুধুমাত্র মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের সমান। আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাণিজ্যের আড়ালে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ৩.৪ শতাংশ। বিশেষ করে বস্ত্র, ভোগ্যপণ্য এবং জ্বালানি আমদানিতে এ ধরনের অনিয়ম বেশি ঘটে।

প্রতিবেদনগুলোতে অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে শুল্ক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংকিং ও নজরদারি ব্যবস্থায় কিছু দুর্বলতা রয়েছে। যদিও সব ব্যাংক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তালিকা যাচাই করতে সক্ষম, তবে আমদানি-রপ্তানির মূল্য যাচাইয়ের তথ্যভাণ্ডারের সুযোগ অর্ধেক ব্যাংকেরই রয়েছে।

জিএফআইয়ের প্রতিবেদনের এই তথ্য বাংলাদেশে অর্থ পাচারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য প্রভাবের ওপর একটি বিশদ চিত্র উপস্থাপন করছে। এতে স্পষ্ট হয় যে, বাণিজ্য চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ না করলে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ