নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র হজ পালন উপলক্ষে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের সৌদি আরবে পরিবহনের জন্য ‘হজ ফ্লাইট-২০২৬’ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। আগামীকাল শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে এই হজ ফ্লাইটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এ বছর বাংলাদেশ থেকে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন ধর্মপ্রাণ মুসলমান পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গমন করবেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সুষ্ঠু, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল হজ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং সৌদিয়া এয়ারলাইন্সসহ সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোর সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় ৪১৯ জন হজযাত্রী নিয়ে সৌদি আরবের জেদ্দার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে এবারের হজ মৌসুমের প্রথম ডেডিকেটেড হজ ফ্লাইট। প্রথম ফ্লাইটের যাত্রীদের সার্বিক সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন এবং হজ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, হজ এজেন্সির প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
হজযাত্রীদের জন্য এবারের হজ ব্যবস্থাপনায় অন্যতম বড় স্বস্তির বিষয় হলো বিমান ভাড়া হ্রাস। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য এবং বিমান পরিচালনার আনুষঙ্গিক ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েও হজযাত্রীদের ওপর আর্থিক চাপ কমাতেই সরকারের পক্ষ থেকে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রতিটি টিকিটের মূল্য ১২ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই ১২ হাজার টাকা সাশ্রয় সাধারণ হজযাত্রীদের হজ পালনের মোট খরচের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং তাদের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও লাঘব করবে। ভাড়া কমানোর পাশাপাশি হজযাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এবার ফ্লাইটের শিডিউল বা সময়সূচিও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত এই শিডিউলের কারণে অতিরিক্ত ফ্লাইটের ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হয়েছে, যার ফলে যাত্রীরা তাদের নির্ধারিত সময়ে কোনো ধরনের ফ্লাইট বিপর্যয় বা বিলম্ব ছাড়াই যাত্রা করার সুযোগ পাবেন।
হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার প্রাক্কালে রাজধানীর আশকোনা হজ ক্যাম্পে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা ও ব্যাপক প্রস্তুতি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হজযাত্রীরা ইতোমধ্যে হজ ক্যাম্পে এসে জড়ো হতে শুরু করেছেন। সেখানে অবস্থানকালে তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মেনিনজাইটিস ও ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ অন্যান্য বাধ্যতামূলক টিকা প্রদান, ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া এবং হজের নিয়মকানুন সম্পর্কে চূড়ান্ত ব্রিফিং দেওয়া হচ্ছে। হজ ক্যাম্পের সার্বিক নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া, হজযাত্রীদের আবাসন, মানসম্মত খাদ্য সরবরাহ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) যৌথভাবে সার্বক্ষণিক তদারকি করছে। ক্যাম্পে স্থাপিত তথ্যকেন্দ্র থেকে যাত্রীদের ফ্লাইট সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য প্রদান করা হচ্ছে।
হজ পালনকালে বাংলাদেশি নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য ও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে সৌদি আরবে পৌঁছেছে ১৭১ সদস্যের একটি বিশেষ মেডিকেল টিম। অভিজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত এই দল মক্কা, মদিনা, মিনা, মুজদালিফা ও আরাফাতের ময়দানে হজযাত্রীদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করবে। হজ পালন একটি কায়িক শ্রমসাধ্য ইবাদত হওয়ায় এবং সৌদি আরবের অত্যধিক গরম আবহাওয়ার কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিশেষ করে বয়স্ক, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভোগা এবং শারীরিকভাবে দুর্বল হজযাত্রীদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার জন্য এই মেডিকেল টিমকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশ হজ মিশনের তত্ত্বাবধানে তারা বিভিন্ন অস্থায়ী ক্লিনিক ও মোবাইল মেডিকেল ইউনিটের মাধ্যমে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ ও চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত, আবাসন ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা একটি জাতীয় পর্যায়ের বড় কর্মযজ্ঞ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং হজযাত্রীদের ভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হজ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ডিজিটালাইজেশন ও কাঠামোগত সংস্কার আনা হয়েছে। ‘রুট টু মক্কা’ ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হজযাত্রীদের সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার সুবিধা চালু রয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের জেদ্দা বা মদিনা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার ভোগান্তি পোহাতে হয় না, তারা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি নিজেদের নির্ধারিত হোটেলে চলে যেতে পারেন। এ বছরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে। পাশাপাশি, যেকোনো ধরনের অনিয়ম, প্রতারণা রোধে এবং হজ এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মনিটরিং করতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একাধিক ভিজিল্যান্স টিম কাজ করছে। সব মিলিয়ে এবারের হজ যাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর আরামদায়ক, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।


