রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ: সংসদে আইনমন্ত্রী

রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ: সংসদে আইনমন্ত্রী

আইন আদালত ডেস্ক

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও ভিন্নমত দমনের লক্ষ্যে দায়ের করা মিথ্যা এবং হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ সচেতন রয়েছে। এসব মামলা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রত্যাহারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এদিন সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিগত সরকারের আমলে দায়ের করা মামলাগুলো নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ বিরাজ করছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাধারণ নাগরিকদের আইনি প্রক্রিয়ায় দমনের হাতিয়ার হিসেবে এসব মামলা ব্যবহার করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা অভিযোগ করে আসছিল। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্য বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর এবং কোনো নিরপরাধ নাগরিক যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আইনি হয়রানির মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হয়রানিমূলক মামলাগুলো চিহ্নিত করা এবং তা প্রত্যাহারের আইনি প্রক্রিয়াকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য সরকার ইতোমধ্যে দুটি স্তরে কাজ শুরু করেছে। আইনমন্ত্রী সংসদকে জানান, এসব হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করার লক্ষ্যে গত ৫ মার্চ জেলা পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সমন্বয়ে গঠিত চার সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি তৃণমূল পর্যায়ে দায়ের করা মামলাগুলোর প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করবে। ভুক্তভোগীরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় এই কমিটির কাছে আবেদন করতে পারবেন। প্রাথমিক পর্যালোচনায় কোনো মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হলে, জেলা কমিটি তা প্রত্যাহারের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে সুপারিশ প্রেরণ করবে।

জেলা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গত ৮ মার্চ একটি উচ্চপর্যায়ের ‘কেন্দ্রীয় কমিটি’ গঠন করেছে সরকার। ছয় সদস্যবিশিষ্ট এই কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্বয়ং আইনমন্ত্রী। এই কমিটি মূলত জেলা পর্যায় থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। কেন্দ্রীয় কমিটি নিশ্চিত করবে যে, মামলা প্রত্যাহারের এই প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকৃত অপরাধী যেন পার পেয়ে না যায় এবং কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার ব্যক্তিরাই যেন আইনি প্রতিকার পান। মন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় কমিটি ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে এবং মামলা প্রত্যাহারের এই প্রক্রিয়াটি বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে।

মামলা প্রত্যাহারের পরিধি সম্পর্কেও সংসদে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, সংসদ সদস্যসহ যেকোনো সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করা যাবে। এর মধ্যে হত্যা মামলার মতো গুরুতর ও জামিন অযোগ্য অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করা হলে গঠিত জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটি এসব মামলা গভীরভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় যদি কোনো হত্যা মামলাও সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে হয়রানিমূলক বা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়, তবে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গক্রমে মন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে, এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল। তবে সেই কমিটির নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে সে সময় কোনো হত্যা মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ রাখা হয়নি। বর্তমান সরকার এই নীতিতে পরিবর্তন এনেছে, কারণ বিগত সময়ে অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে হত্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করার অসংখ্য নজির রয়েছে বলে আইনি বিশ্লেষকরা মনে করেন।

দেশের বিচারিক আদালতগুলোতে বর্তমানে লাখ লাখ মামলার জট রয়েছে, যার একটি বড় অংশই হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা এসব হয়রানিমূলক মামলা। বিগত সরকারের সময়কালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যথেচ্ছভাবে বিস্ফোরক আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় এসব মামলা দায়ের করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে একটি ঘটনার বিপরীতে শত শত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়েরের রেওয়াজ তৈরি হয়েছিল। সরকারের বর্তমান উদ্যোগটি এই কাঠামোগত হয়রানির অবসান ঘটাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে মামলার বিশাল জট ও চাপ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। একইসঙ্গে বছরের পর বছর ধরে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া হাজার হাজার ভুক্তভোগী পরিবার আর্থ-সামাজিক ও মানসিক হয়রানি থেকে মুক্তি পাবে। আইনমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষে দৃঢ়তার সঙ্গে পুনরুল্লেখ করেন যে, সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলা থেকে ভুক্তভোগীদের দ্রুততম সময়ে প্রতিকার প্রদানে আন্তরিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপকে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ