সরকারি আইনজীবী নিয়োগে পূর্ববর্তী অনিয়মের অভিযোগ: ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়ায় আইন মন্ত্রণালয়

সরকারি আইনজীবী নিয়োগে পূর্ববর্তী অনিয়মের অভিযোগ: ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়ায় আইন মন্ত্রণালয়

আইন আদালত ডেস্ক

গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করা নতুন সরকার দেশের বিচার বিভাগে সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়গুলো পর্যালোচনা শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উচ্চ আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং নিম্ন আদালতগুলোতে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, যোগ্যতার অভাব এবং মৃত ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। নতুন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে শিগগিরই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে উচ্চ আদালতে ১০৩ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) এবং ২৩০ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) কর্মরত রয়েছেন। ৫ আগস্টের পূর্বে বিগত সরকারের আমলে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৬০ থেকে ৬৮ জন এবং ১৪৩ জন। সংবিধানে একজন অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার’ অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিনজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগের বিধান রয়েছে। তবে ডিএজি এবং এএজি পদে ঠিক কতজনকে নিয়োগ দেওয়া যাবে, তা আইনে সুনির্দিষ্ট করা নেই। এই আইনি অস্পষ্টতার কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সময়ে এই নিয়োগের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

বিপুলসংখ্যক এই নিয়োগের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আবুল হাসানকে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, এক বিচারপ্রার্থীর কাছ থেকে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, পূর্ববর্তী সময়ে নিয়োগ পাওয়া আইন কর্মকর্তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হবে এবং দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, আগামী ১৯ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট খোলার পর অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু হতে পারে।

অন্যদিকে, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও সম্প্রতি পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া ৯ মার্চ মার্জিনা রায়হান ও মোহাম্মদ জহিরুল আমিনকে নতুন প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এর আগে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দি এক আসামিকে জামিন পাইয়ে দেওয়ার চুক্তিতে ১ কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠায় প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার পদত্যাগ করেন। ফাঁস হওয়া একটি অডিও রেকর্ডের সূত্র ধরে এই অভিযোগের অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। নতুন চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২১টি মামলার বিচারকাজসহ প্রসিকিউশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে কাজ চলছে। পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে আরও কয়েকজন প্রসিকিউটরকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।

নিম্ন আদালতে সরকারি আইনজীবী বা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগেও ব্যাপক অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে। গত অক্টোবরে সারা দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে প্রায় সাড়ে চার হাজার পিপি ও সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা জেলাতেই ৬৭০ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জামালপুরে দুই বছর আগে মারা যাওয়া আনোয়ার হোসেন নামের এক আইনজীবীকে অতিরিক্ত জিপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া একই তালিকায় একজনের নাম দুবার আসার ঘটনাও ঘটে, যা নিয়ে স্থানীয় আইনজীবীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাধারণত চারজন আইন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করলেও সেখানে ৮৪ জনকে এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতে নয়জনের স্থলে ৬১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সলিসিটর অনুবিভাগের তথ্যমতে, ঢাকার আদালতগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য মোট ৬৫৯ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

দুর্নীতি দমন সম্পর্কিত মামলা পরিচালনার জন্য সারা দেশে ৩৭টি বিশেষ জজ আদালত রয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি ঢাকায় অবস্থিত। এসব আদালতে বিচারক ও আইন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টিও বর্তমান সরকারের পর্যালোচনায় রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন ও আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত কার্যক্রমে ব্যস্ততার কারণে নতুন আইনজীবী নিয়োগ প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। আইনজীবীরা মনে করছেন, বিচারপ্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দ্রুত এই সংস্কার প্রয়োজন।

প্রসঙ্গগত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার এসব নিয়োগ, আইনি কাঠামোর ব্যবহার এবং আনুষঙ্গিক অভিযোগের বিষয়ে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ