অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ইরান কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কিছুটা শান্তির সম্ভাবনা জোরদার হওয়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো মার্কিন ডলার দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস এবং কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিবিমুখ মনোভাব কমিয়ে এনেছে, যার ফলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত ডলারের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সঙ্গে নতুন বৈঠকের ইঙ্গিত বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তুলনামূলক ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এর ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগের প্রবণতা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত মার্কিন ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এশীয় মুদ্রাবাজারের লেনদেনে প্রধান মুদ্রাগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। লেনদেন অনুযায়ী ইউরো প্রায় ১ দশমিক ১৭৮৩ মার্কিন ডলারে এবং ব্রিটিশ পাউন্ড প্রায় ১ দশমিক ৩৫২৬ মার্কিন ডলারে অবস্থান করছে। বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দুই মুদ্রা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতকালীন সময়ে যে চাপের মধ্যে ছিল, তা অনেকাংশে কাটিয়ে উঠে বর্তমানে সাত সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
ওসিবিসি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিশ্লেষক সিম মোহ সিওং বলেন, বাজার বর্তমানে তুলনামূলক স্থিতিশীল পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তার মতে, যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য কূটনৈতিক অগ্রগতির বিষয়টি আগেই বাজার মূল্যে অনেকাংশে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে নতুন করে বড় ধরনের ওঠানামার জন্য অতিরিক্ত প্রভাবক বা অনিশ্চয়তা প্রয়োজন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মুদ্রাবাজার বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে তেলের দামে ওঠানামা বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বর্তমানে অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
মার্কিন ডলার জাপানি ইয়েনের বিপরীতে সামান্য শক্তিশালী হয়ে ১৫৯ দশমিক ২৬ পর্যায়ে অবস্থান করছে। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ান ডলার চার বছরের উচ্চতার কাছাকাছি অবস্থান করছে বলে বাজার তথ্য থেকে জানা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব মুদ্রায় স্থিতিশীলতা ও শক্তিশালী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নীতির দিকনির্দেশনা নিয়েও বাজারে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি বছরে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে, যা ডলারের ওপর দীর্ঘমেয়াদে মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ সুদের হার দীর্ঘ সময় বজায় থাকলে ডলার সাধারণত শক্তিশালী অবস্থানে থাকে, তবে বৈশ্বিক ঝুঁকি কমে গেলে নিরাপদ মুদ্রার চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পায়।
অন্যদিকে গ্রুপ অব সেভেন (জি-৭) দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নররা যৌথভাবে জানিয়েছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় তারা সমন্বিতভাবে প্রস্তুত রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সমন্বয় অব্যাহত রাখবেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে অনিশ্চয়তা হ্রাস পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে মার্কিন ডলার আপাতত চাপের মুখে থাকলেও বাজার পরিস্থিতি নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ঘটনার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।


