আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময় এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই অস্থিতিশীল বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে।
শনিবার সকালে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলারে নেমে আসে। অথচ মাত্র একদিন আগে শুক্রবার সকালেও এই তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারের ওপরে। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রতি ব্যারেলে দাম কমেছে প্রায় ১০ ডলার। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পর হরমুজ প্রণালি নিয়ে এই ইতিবাচক বার্তা বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী করে তুলেছে।
ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জলপথ হিসেবে বিবেচিত। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে এই পথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের নিচ থেকে লাফিয়ে ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে এই জলপথকে আমরা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
ইরানের এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় দাবি করেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রণালিটি আর যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী ও টেকসই চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ-অবরোধ শিথিল করা হবে না। মূলত ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরই ইরান এই কৌশলগত ঘোষণা দিল।
ইরানের এই ঘোষণার প্রভাব সরাসরি পড়েছে বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্রে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের বাজারেও তেজি ভাব লক্ষ্য করা গেছে; ফ্রান্সের ক্যাক ও জার্মানির ড্যাক্স সূচক প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচকও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে।
তবে জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরলেও নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা বিমকো (BIMCO) জানিয়েছে, রাজনৈতিক ঘোষণা এলেও সমুদ্রপথে মাইন বা অন্যান্য বিস্ফোরকের ঝুঁকি এখনো বিদ্যমান। সংস্থাটির নিরাপত্তাপ্রধান জ্যাকব লারসেন সতর্ক করে বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হচ্ছে, ততক্ষণ জাহাজ চলাচলকে পুরোপুরি নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। একই সুরে কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আরসেনিও ডোমিঙ্গেজ। তিনি জানান, প্রণালি চালুর বিষয়টি কারিগরিভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তেলবাহী জাহাজ পরিচালনাকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান স্টেনা বাল্ক জানিয়েছে, তারা এখনই তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার পরই তারা পুনরায় এই রুট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থনীতিবিদ ও সরবরাহ চেইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক মাসের অচলাবস্থার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। বেইস বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক মনমোহন সোধি মনে করেন, সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরতে অন্তত কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনই কমবে—এমনটা ভাবার সুযোগ কম।
উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালি কেবল জ্বালানি তেলের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সার তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে সারাবিশ্বে সরবরাহ করা হয়। দীর্ঘদিন এই রুট বন্ধ থাকায় সার ও কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। ইরানের নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে তেল ও গ্যাসের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে সার ও অন্যান্য কাঁচামালের দামও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


